বিদেশ

বিদেশ

ইসরায়েলের ঠিকাদার ফাতাহ!

রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ভৌগোলিক প্রভাব; উভয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে ফিলিস্তিনের এক মেরুতে ফাতাহ এবং আরেক মেরুতে থাকছে হামাস। আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) নেতৃত্বে ফাতাহ শুধু পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে ফাতাহ হেরে যাওয়ার পরও পিএর নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। তবে ওই নির্বাচনে পরপরই গাজা থেকে তাদের বের করে দেয় হামাস।

গাজাকে কেন্দ্র করে গত ৭ অক্টোবর থেকে হামাস ও ইসরায়েলের চলতি সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়ে উঠেছে, হামাসকে হটিয়ে গাজায় পিএ তথা ফাতাহর শাসন শুরু হতে যাচ্ছে কি না। তবে ফিলিস্তিনের মুক্তির প্রশ্নে ফাতাহর ভূমিকা এবং শাসনতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে পিএর কর্মকা- ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত পিএ প্রশাসনের আপসমূলক আচরণ এখন ফিলিস্তিনিদের মুখে মুখে ফেরে।

পশ্চিম তীরের বিরজেইত বিশ^বিদ্যালয়ের লেকচারার আবোদ হামায়েল বলেন, ফাতাহ কিংবা পিএর কৌশল হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতায় থাকা; অন্যদিকে হামাসের কৌশল সামরিক। মতাদর্শগতভাবে বিচার করলে, হামাস যেখানে সশস্ত্র উপায়ে স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে, সেখানে ফাতাহ নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংকট সমাধানের পক্ষপাতী। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া হচ্ছে, সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনের শাসক হিসেবে গাজায় ফাতাহ তথা পিএ ফিরে আসুক। আর ইসরায়েলের চাওয়া হচ্ছে, গাজায় হামাসকে নিশ্চিহ্ন করা। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল হামাসকে আপাত অর্থে নির্মূল করতে সমর্থ হওয়ার পর যদি ওয়াশিংটন এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের কথামতো গাজায় পিএর শাসন শুরু হয়; তাহলে পরিস্থিতি সহজ হবে না। কারণ ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা পিএর কর্তৃত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে যেখানে দুর্নীতি, আপস ও নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন নিয়ে তাদের কড়া অবস্থান দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নব্বইয়ের দশকে ফাতাহ নেতা ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক রবিনের মধ্যে সই হওয়া অসলো শান্তিচুক্তির মাধ্যমেই গড়ে ওঠে পিএ। ওই সময় ফাতাহ এই চুক্তিকে ভবিষ্যতের স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার পথনকশা হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে সেই স্বপ্ন ফিকে হয়েছে এবং পশ্চিম তীরে সাত ইহুদির অবৈধ বসতি তৈরি হয়েছে।

হামাস ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান নিষ্পেষণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে। এ বিষয়ে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ইজ্জত আল-রাশেক বলেন, ‘পশ্চিম তীরে দখলদারদের অব্যাহত সহিংসতা ও অব্যাহত দখলদারি গত ৭ অক্টোবরের আক্রমণের অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ নিয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তারা শোনেনি।’ গাজা উপত্যকায় ফাতাহর সীমিত প্রভাব রয়েছে। সেখানে দলটির অনুসারীরা দুই ভাগে বিভক্ত। একাংশ মাহমুদ আব্বাসের অনুসারী। আরেক অংশ দলটির সাবেক নেতা মোহাম্মেদ দাহলানের অনুগত যিনি গত ১০ বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) নির্বাসিত। তাকে আব্বাস বহিষ্কার করেছিলেন।

ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস পশ্চিমা বিশে^র সঙ্গে দেন-দরবার করে অবৈধ বসতি বন্ধ, ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নে কিছুই করতে পারেননি। এর থেকেও গুরুতর হলো, গাজা ও পশ্চিম তীর নির্বিশেষে হতাশাগ্রস্ত ফিলিস্তিনিরা পিএর ভূমিকাকেই সন্দেহের চোখে দেখে। ব্যাপক অংশের ফিলিস্তিনিরা পিএ প্রশাসনকে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসরায়েলের নিয়োগ করা ‘সহকারী ঠিকাদার (সাব-কন্ট্রাক্টর)’ মনে করে। এমন মনোভাবের কারণ হলো, সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগণকেই বিচারিক কাঠামোতে হয়রানি করে পিএ। ‘লয়ার্স ফর জাস্টিস’ নামের একটি সংগঠন জানায়, গত বছর পিএ ইসরায়েলবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে পাঁচ শতাধিকেরও বেশি ফিলিস্তিনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার করে।’ এ অবস্থায় ফিলিস্তিনিদের অনেকে বলছেন, আগামী দিনে তৃতীয় দফার ইন্তিফাদায় (ফিলিস্তিনিদের গণজাগরণ) পিএ প্রশাসনের পতন হবে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সহিংসতা সারা বছর ধরেই চলতে থাকে। সেখানে তরুণরা ইসরায়েলি দখলদারদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই করে যাচ্ছে এবং তারা একেই শ্রেয়তর মনে করে। হামাসের প্রভাব যে শুধু গাজায় রয়েছে তা নয়, বরং পশ্চিম তীরে জনপ্রিয়তার ভিত্তি তৈরি করেছে। ইসরায়েলি বর্বরতা পশ্চিম তীরে যতগুণ বাড়ছে, হামাসের ভিত্তি তত শক্ত হচ্ছে। এর উল্টোদিকে ফাতাহ তথা পিএ প্রশাসনের জনপ্রিয়তার রাশ আলগা হচ্ছে। সম্প্রতি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ফাতাহ-সমর্থিত সংগঠনকে হারিয়ে হামাস-সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ইসলামি ওয়াফা ব্যাপক বিজয় অর্জন করে।

সম্প্রতি ‘প্যালেস্টিনিয়ানস সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চ’ একটি জরিপ পরিচালনা করে। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগেই এ জরিপ পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ ফিলিস্তিনি পিএ প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করে। ফিলিস্তিনের ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করে, পিএ প্রশাসনের সম্পদের তুলনায় দায়দেনা বেশি। গাজা শাসন করার মতো বাস্তবতায় যে পিএ কিংবা ফাতাহ নেই তাতে একমত ইয়াসির আরাফাতের ভাগ্নে নাসের আল-কুদওয়া যাকে একসময় পিএর ভবিষ্যৎ ভাবা হতো। তার ভাষ্য, ‘আমি মনে করি, এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় প্রধান দায়িত্ব পালন তো দূরে থাক; বিদ্যমান কর্তৃপক্ষ, এর বর্তমান কাঠামো এবং যারা এর নেতৃত্ব গাজায় পা রাখতে সক্ষম নন।’

এ অবস্থায় যুদ্ধের পর গাজা কিংবা পুরো ফিলিস্তিন প্রশ্নে সম্ভাব্য আলোচনায় হামাসের প্রতিনিধিত্বের ওপর জোর দেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাফি জাবারি। গাজায় ফিলিস্তিনিরা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা অন্য কাউকেই গ্রহণ করবে না, এমন কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হামাস ফিলিস্তিনি সমাজদের অংশ। তাদের নির্মূল করা যাবে না। হামাস গেলে, আরেক হামাস জন্ম নেবে। ইসরায়েলের ট্যাংকে চেপে কেউ গাজায় প্রবেশ করতে চাইলে তা কখনই গ্রহণ করবে না ফিলিস্তিনিরা।’

এসবের বাইরে ৮৮ বছর বয়সী আবু মাজেন তথা আব্বাস বস্তুত ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে হাস্যকর প্রতিমূর্তি অর্জন করেছেন। চার বছর মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় বসে তিনি ১৮তম বছর পার করছেন। ২০১০ সালে ভোট হওয়ার কথা বলা হলেও তা স্থগিত হয়। পিএ প্রশাসনের যত শাখা-প্রশাখা রয়েছে, তার কারও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রায় নেই। এর মধ্যে আব্বাসের স্থান দখলের প্রতিযোগিতাও দৃষ্টিকটুভাবে উন্মোচিত হয়। হুসেইন আল-শেইখ যিনি পিএলওর কার্যনির্বাহী কমিটির মহাসচিব। তাকে যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করে এবং তিনি পদ দখল করতে চান। তিনি নাকি ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের সঙ্গেও বেশ পরিচিত। আরেকজন হলেন মাওয়ান বারঘোতি। ধারণা করা হয়, ২০২১ সালের বাতিল হওয়া পিএ নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হতে পারতেন। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন যারা আব্বাসের পদে আসতে মরিয়া। ফিলিস্তিনের মুক্তি নিয়ে তাদের আগ্রহ কতটা, তাও সন্দেহের বিষয়।

বিষয়:
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত