
৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২২২টি আসনে জয়লাভ করে করে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথ পরিক্রমায় ১০ই জানুয়ারি টানা চতুর্থবার এবং মোট পঞ্চমবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। যদিও বিএনপিসহ কয়েকটি সমমনা রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৭ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে ।
মূলত বিরোধীজোট নানা ইস্যুতে ২০১৩-১৪ সাল থেকেই সরকার বিরোধী আন্দোলন করে আসছে। সর্বশেষ সরকারের পদত্যাগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০১৮-১৯-এর সংসদ নির্বাচনসহ ৭ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও ঠেকাতে পারেনি। রাজনৈতিক দল হিসেবে মাঠ পর্যায়ে বিএনপি জোটের একটা শক্তিশালী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মামলায় দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলে এবং দেশের বাইরে পলাতক (আদালতের ভাষায়) থাকায় মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে সরকার-বিরোধী আন্দোলন জমাতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে, এখন এই দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রাজনীতিতে উৎসাহ হারিয়ে অনেকটা হতোদ্যম অবস্থায়। সমর্থকদের বিরাট একটা অংশ রাজনীতি থেকেই নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। আবার বর্তমান ভোটের রাজনীতিতে শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দিতা না থাকায় নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা তরুণদের একটা অংশও রাজনীতিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে বলে সাম্প্রতিক নির্বাচনে লক্ষ্য করা গেছে। দেশে আগামী দিনের রাজনীতির জন্যে এটা কখনই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
“রাজনীতির গেইম কালচারে প্রতিপক্ষ দলকে কৌশলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে সাময়িকভাবে জয়ী হওয়া গেলেও দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ মেয়াদে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেয়া রাষ্ট্রের জন্যে মোটেও মঙ্গলজনক নয়।”
পঞ্চম মেয়াদের এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনীতি বিমুখ তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটা অংশকে, যারা অনেকটা বিভ্রান্তির কারণেই হোক বা স্বেচ্ছায়; এদেরকে রাজনীতির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা। রাজনীতির গেইম কালচারে প্রতিপক্ষ দলকে কৌশলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে সাময়িকভাবে জয়ী হওয়া গেলেও দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ মেয়াদে রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেয়া রাষ্ট্রের জন্যে মোটেও মঙ্গলজনক নয়। একই সাথে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে চিহ্নিত ব্যক্তি, সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক অধিকার থাকাও একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্যে হুমকিস্বরূপ।
দেশে-বিদেশে ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। বলা যায়, শুধুমাত্র ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব এবং দৃঢ়তার প্রতি দেশের সকল শ্রেণির মানুষের প্রবল আস্থার কারণেই ৭ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব শক্ত কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এখন, দল এবং সরকারের সাফল্য নির্ভর করছে ব্যক্তি শেখ হাসিনার এই ক্যারিশমাকে ধারণ করার ওপর।
“জানতে হবে, এদের চাওয়া কী! তাদের চাওয়ায় যদি কোন ভুল থাকে, সেই ভুল থেকে তাদের কিভাবে বের করে আনা যায়, তার সঠিক পথ বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদেই তৈরি করে দিতে হবে।”
যতটুকু জানা যায়, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জীবনে এটাই শেষ নির্বাচন। এরপরে তিনি দল থেকে অবসর নেবেন। তাঁর অবসর নেয়ার আগেই রাষ্ট্রনেতা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেই গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে এখন থেকেই সরকার, দল এবং সংশ্লিষ্ট মহলকে কাজে নামতে হবে। সকল শ্রেণির তরুণদের কাছে যেতে হবে। জানতে হবে, এদের চাওয়া কী! তাদের চাওয়ায় যদি কোন ভুল থাকে, সেই ভুল থেকে তাদের কিভাবে বের করে আনা যায়, তার সঠিক পথ বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদেই তৈরি করে দিতে হবে। সকল অপশক্তিকে রুখতে আগামীদিনের শক্তির উৎস, অপার সম্ভাবনাময় তারুণ্যকে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় করতে উৎসাহিত করতে হবে। উঠে আসার সুযোগ দিতে হবে নতুন নতুন নেতৃত্বকে। শেখ হাসিনা সরকারের শেষ মেয়াদের এই সময়ের মধ্যে এই সমস্যার মূল চিহ্নিত করে তার কার্যকর সমাধান বের করতে হবে। তা না হলে আগামীতে তরুণদের এই রাজনৈতিক বিতৃঞ্ষার সুযোগে অপশক্তিগুলো রাজনীতির সকল ক্ষেত্রকে গ্রাস করে ফেলবে। এরা সুস্থ রাজনীতির ধারাকে পুরোপরি ধ্বংস করে দেবে। বিপন্ন করে দেবে পুরো রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে।
ঢাকা,
১৪.০১.২০২৪।