
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল প্রায় নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এবারই প্রথম তারা এমন সাফল্য অর্জন করল।
বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদেই শিবির প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ভিপি পদে সাদিক কায়েম তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত আবিদুল ইসলাম খানকে নয় হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন। প্রায় প্রতিটি পদেই এমন বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই–আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শিবিরের নেতৃত্বের ন্যারেটিভই এই নির্বাচনে তাদের বিজয়ের অন্যতম বড় কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, “গণ অভ্যুত্থানের মালিকানা নিয়ে যে লড়াই ছিল, সেখানে শিবির নিজেদের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই ধারণাই শিক্ষার্থীদের মনে প্রভাব ফেলেছে।”
ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি সাদিক কায়েম নির্বাচনের পর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “যে মতেরই হোক না কেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই। এই জয় আসলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিজয়।” তিনি নিহতদের স্মরণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
নির্বাচনে জয়ী জিএস ও শিবিরের ঢাবি শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, “শিক্ষার্থীরা যাকে যোগ্য মনে করেছেন তাকেই ভোট দিয়েছেন। এটা স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতিফলন।”
তবে এই ফলাফলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেক সাবেক ছাত্রনেতা। সাবেক ডাকসু জিএস মুশতাক হোসেন বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়েছে বর্তমান প্রজন্ম। নানা বৈষম্যের বিপরীতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতিকে তরুণরা সুযোগ দিতে চেয়েছে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “শিবির যদি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী পথে যায়, তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ গড়ে উঠতে সময় লাগবে না।”
তলেতলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ছাত্রলীগের সব ভোট শিবির নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে বিএনপি হেরেছে আপনারা বলতে পারেন। আমি কিন্তু বলতে পারছি না। জামায়াতের এত ভোট কোত্থেকে এল, হিসাব মেলে না। গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছি। বিভিন্ন দল যখন আমরা একসঙ্গে বসি, বলা হয় খেয়াল রাখতে হবে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে হবে। তারা আবার এলে কচুকাটা কাটবে। কিন্তু তলেতলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ছাত্রলীগের সব ভোট নিয়ে নিয়েছে শিবির। বিএনপির বিরুদ্ধে দেশে ও দেশের বাইরে ষড়যন্ত্র চলছে।’
ছাত্র আন্দোলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, এ প্রজন্ম দুর্বৃত্তায়িত ও চাঁদাবাজ রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে এবং পরিবর্তনের দাবি তুলছে।
তিনি বলেন, ‘৩০-৪০ বছর আগেও একটা রাজনৈতিক দল মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। কেউ দেখে ফেললে তাদের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি হতো। এখন মাথা উঁচিয়ে আমাদের সামনে আসছে। বড় দল যারা, তাদেরও চ্যালেঞ্জ করছে। বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা দিয়ে বলছে, যেভাবে বলা হচ্ছে, তার সবকিছু ঠিক নয়।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি হবে জাতীয় রাজনীতির কালো থাবামুক্ত এবং শিক্ষার্থী তথা জাতির কল্যাণে। ক্যাম্পাস হবে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া-গবেষণা, গান-কবিতা, আড্ডা-বন্ধুত্ব, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার তীর্থভূমি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদে বিজয়ীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ঐতিহাসিক ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচনে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী বন্ধুদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে যাঁরা অত্যন্ত ধৈর্য, কৌশল ও দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, অংশগ্রহণমূলক সফল নির্বাচন সম্পন্ন করেছেন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অবশ্য মন্তব্য করেছেন, ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতির ভূমিধস পরাজয় হয়েছে।
তিনি বলেন, ছাত্রশিবিরের বিশাল বিজয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে এখন। আমি শুধু একটা কথা বলব। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতির ভূমিধস পরাজয় হয়েছে। হাসিনার আমলে শিবির ট্যাগ নিয়ে অগণিত শিবিরকর্মী ও সাধারণ ছাত্রদের প্রতি অমানুষিক নির্যাতন হয়েছে। শিবির সন্দেহে পেটানোর পর পুলিশে সোপর্দের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। আমি অবিরামভাবে এর তীব্র প্রতিবাদ করেছি। নানা হুমকি ও আক্রমণ এসেছে, কখনো থামিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, পরাজিত ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও ভোটে প্রভাব ফেলেছে। মেয়েদের হলগুলোর বেশিরভাগ ভোটও গেছে শিবিরের ঝুলিতে।
অন্যদিকে, ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা নির্বাচন ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন।
স্বাধীনতার পর নবমবারের মতো অনুষ্ঠিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে এ ফলাফল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।