
ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল নিজের কিছু করার। কর্পোরেট অফিসে চাকরি করলেও মনে হতো শুধু চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না, চাই নিজের আলাদা পরিচিতি। সেই স্বপ্ন নিয়েই চার হাজার টাকা হাতে নিয়ে শুরু করেছিলেন পথচলা। আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা, গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান Family Collection। শাড়ি, থ্রিপিস, শাল, বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী জামদানী নিয়েই চলছে তার উদ্যোগ।
রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুর কাছে নিজের উদ্যোক্তা জীবন ও ভাবনা জানিয়েছেন মনি রানী চৌধুরী। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।
মনি রানীর এই পথ চলার শুরুটা সহজ ছিল না। আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে পরিচিতজন— অনেকে তার কাজকে ভালোভাবে নেননি। এমনকি পরিচিত একজন অবলীলায় বলে ফেলেছিলেন, ‘মামী, আপনি নাকি কাপড় বেচেন।’ এসব মন্তব্যে তিনি একটুও বিচলিত হননি, বরং কাজের ভেতরেই খুঁজে নিয়েছেন নিজের সাহস আর দৃঢ়তা। এ পথে পরিবারই হয়েছে তার সবচেয়ে বড় শক্তি। মনি রানী চৌধুরী স্পষ্ট করে বললেন, পরিবার এবং বিশেষ করে স্বামীর অব্যাহত সহযোগিতা ছাড়া এই যাত্রায় এত দূর আসা সম্ভব হতো না।
ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাও রয়েছে অনেক। প্রথমদিকে কয়েকজন ক্রেতা পণ্য নিয়ে পেমেন্ট না দিয়ে উধাও হয়ে যান। অভিজ্ঞতার অভাবে কাস্টমার হ্যান্ডলিং সঠিকভাবে করতে পারেননি তিনি। ‘আমাকে ব্লক করে দিয়েছিল, যাতে আমি পাওনা টাকা চাইতে না পারি। তখন খুব খারাপ লেগেছিল, কিন্তু সেখান থেকেই শিখেছি কীভাবে ব্যবসা সামলাতে হয়,’ বলছিলেন তিনি। তার মতে, ব্যর্থতা তাকে দিয়েছে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহস। আজ তার উদ্যোগে রিপিট ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। সেই আস্থা ও বিশ্বাসকেই তিনি মনে করেন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তবে শুধু নিজের সাফল্য নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না মনি রানী। তরুণ প্রজন্মকে তিনি বারবার উৎসাহ দেন চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের ভেতরের প্রতিভা কাজে লাগাতে। তার ভাষায়, প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর ভেতরে কিছু না কিছু সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। সেটা প্রকাশ করতে পারলেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, বেকারত্ব কমবে। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তার পরামর্শ—আত্মবিশ্বাস, লক্ষ্য আর চেষ্টা—এই তিনটি শক্তি যদি একজনের ভেতরে থাকে, তবে সফলতা আসবেই।
নিজেকে কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, সেটা নিয়ে বিনয়ী সংশয় থাকলেও তিনি নিজেকে সফল মনে করেন। এখনো শিখে চলেছেন, অগ্রজদের পরামর্শকেই মনে করেন আর্শীবাদ। ভবিষ্যতে Family Collection–কে দেশজুড়ে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে চান। সেই সঙ্গে দেশের প্রতিও রয়েছে দায়বদ্ধতা। ‘বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। তাই দেশের জন্য দায়িত্বও আমার। ভবিষ্যতে অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছে আছে,’ বললেন তিনি।
তাঁর এই পথচলায় সম্প্রতি যোগ হয়েছে এক নতুন অর্জন। ৭১ মিডিয়া আইকনিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫–এ ‘সাকসেসফুল উইমেন্স এন্ট্রারপ্রেনার’ ক্যাটাগরিতে সম্মানিত হয়েছেন মনি রানী চৌধুরী। এই স্বীকৃতিকে তিনি দেখছেন কেবল নিজের নয়, বরং পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী আর ক্রেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। তার ভাষায়, ‘এই সম্মাননা আগামী দিনে আমাকে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা যোগাবে।’
মনি রানী চৌধুরীর এই গল্প প্রমাণ করে, আত্মবিশ্বাস, লক্ষ্য আর নিরন্তর চেষ্টাই পারে একজন নারীকে দৃঢ়ভাবে দাঁড় করাতে। তার স্বপ্ন যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি সামাজিকও। আর এখানেই তার সাফল্যের আসল শক্তি।