
শৈশব থেকেই রান্নার প্রতি ছিল অদম্য টান। বাবার হাত ধরে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে শেখা, মায়ের তৈরি কেকের ঘ্রাণ কিংবা অতিথিদের প্রশংসা— সব মিলিয়ে ছোটবেলা থেকেই মনে হতো একদিন কিছু করতে হবে নিজের মতো করে। ফৌজি আরা বেগম সেই স্বপ্ন নিয়েই শুরু করেছিলেন পথচলা। আজ তিনি সফল উদ্যোক্তা, গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান আবরারস কিচেন। কেক, ব্রেড, পেস্ট্রি থেকে শুরু করে হাজারো শিক্ষার্থী গড়ে তোলার কাজেই চলছে তার উদ্যোগ।
রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুর কাছে নিজের উদ্যোক্তা জীবন ও ভাবনা জানিয়েছেন ফৌজি আরা। উদ্যোক্তাদের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।
লোকে বলেন, স্বপ্নের বীজ বোনা হয় অজান্তেই। ফৌজি আরার বেলাতেও তাই ঘটেছিল। কখনো বাবার হাত ধরে রান্নার পাঠ, কখনো অতিথিদের প্রশংসা, কখনো আবার মায়ের হাতের কেকের ঘ্রাণ— সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তার ভেতরে জন্ম নেয় রান্নার প্রতি অদ্ভুত এক ভালোবাসা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভালোবাসাই পরিণত হয় পেশার স্বপ্নে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা।
১৯৯৭ সালে ফৌজি প্রথম উদ্যোগ নেন ‘মাতৃছায়া’ নামে একটি ছোট প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকৃত যাত্রার দরজা খুলে যায় বহু বছর পর, ২০২০ সালে। করোনা মহামারির অচেনা ভয়ের মধ্যেই তিনি গড়ে তোলেন ‘আবরারস কিচেন’। লক্ষ্য ছিল দুটি— ঘরোয়া, বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা।
মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ‘আবরারস কিচেন’ হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম প্রশিক্ষণকেন্দ্র। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এখানে হাতে-কলমে বেকিং শিখেছেন। কারও চাকরি হয়েছে বিদেশে, কেউ দাঁড় করিয়েছেন নিজস্ব ব্র্যান্ড, আবার কেউ ঘরে বসেই আয় করছেন নিয়মিত। ফৌজি আরার বিশ্বাস— ‘একজন উদ্যোক্তা মানে শুধু নিজের স্বাবলম্বিতা নয়, বরং আরও অনেকের কর্মসংস্থান।’
তার কোর্সগুলো সাজানো হয় অভিজ্ঞতার আলোকে। তিন দিনের বেসিক কেক থেকে শুরু করে এক সপ্তাহের অ্যাডভান্স কেক, ব্রেড কিংবা প্যাটিসেরি— প্রতিটি কোর্সই হাতে-কলমে শেখানো হয়। শুধু রেসিপি নয়, শেখানো হয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করা, কম খরচে প্যাকেজিং, সঠিক দাম নির্ধারণ, এমনকি নিজের ব্র্যান্ড দাঁড় করানোর কৌশলও। গুণগত মান নিয়ে তিনি একদমই আপস করেন না। তার ভাষায়, ‘যা আমরা বানাই, তাই আমরা খাই। গ্রাহক আর আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’
অবশ্য এই পথ একেবারেই সহজ ছিল না। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নানা সামাজিক বাঁধা তাকে থামাতে চেয়েছে বারবার। সমালোচনা এসেছে, প্রতিবন্ধকতা এসেছে। কিন্তু শক্তি জুগিয়েছেন পরিবার— মা, বড় বোন আর দুই মেয়ে। ফৌজি বিশ্বাস করেন, লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে কোনো প্রতিকূলতাই স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারে না।
শুধু ব্যবসা নয়, তার কাজের ভেতরে আছে মানবিকতার ছোঁয়াও। অসচ্ছল নারীদের তিনি বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। এর ফলে অনেক নারী আজ ঘরে বসে আয় করছেন, কেউ গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ছোট প্রতিষ্ঠান, আবার কেউ বিদেশে গিয়ে পেশাদার বেকার হিসেবে কাজ করছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান ‘আবরারস কিচেন’ হয়ে উঠুক অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিষ্ঠান, হোক নতুন উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র। তার বার্তা নারীদের উদ্দেশে স্পষ্ট— ‘শেখার কোনো বয়স নেই। সুযোগ পেলে শুরু করুন। হাল ছাড়বেন না। একদিন এই দক্ষতাই হবে আপনার জীবনের ভরসা।’
আজ ফৌজি আরা বেগম কেবল একজন পেস্ট্রি শেফ নন। তিনি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির কারিগর, স্বপ্ন গড়ার প্রেরণা। তার হাত ধরে জন্ম নিচ্ছে নতুন আস্থা, নতুন সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাই হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে আরও এক ধাপ সামনে।