
ছোটবেলা থেকেই ওয়াসেকা তাসনীমের মনে ছিল নিজের কিছু করার ইচ্ছে। বরিশালে জন্ম হলেও তার শৈশব কাটে দেশের নানা জেলায়, বাবার চাকরির কারণে। সেই সময়ে দেখা নানা শহরের রঙ, মানুষের ভিড় এবং ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তার জীবনে ছাপ ফেলেছে। শৈশবের এইসব স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ছিল তার সৃজনশীলতার বীজ, যা পরে ঘরে বানানো কেক এবং হাতের তৈরি গিফট পণ্যে ফুটে উঠেছে। তাকে প্রেরণা দিয়েছে একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন।
রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুর কাছে ওয়াসেকা তাসনীম নিজের উদ্যোক্তা জীবন ও ভাবনা জানিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।
ওয়াসেকার শৈশবের একটি মুহূর্ত আজও তার মনে জীবন্ত। স্কুল যাত্রার পথে মায়ের কাছে চাওয়া ১০ টাকার পেস্ট্রি— ‘সেই ছোট্ট মুহূর্তটাই হয়তো আমাকে কেক বানানোর দিকে টেনে এনেছিল,’ বলেন তিনি।
ফুলটাইম গৃহিণী হওয়ার পরও ওয়াসেকার মনে ছিল কিছু বড় করার ইচ্ছে। করোনাকালের প্রথম দিকে, যখন সবাইকে বাসায় থাকতে হয়েছিল, তখনই স্বামী ইমরান হাসান তারিফের সঙ্গে ঘরের ছোট্ট কোণে জন্ম নিল বাবা’স বেকিং জোন। এই উদ্যোগের নামকরণ করা হয়েছে তাদের সন্তানের বাবার নাম ধরে, কারণ পেশায় সফটওয়্যার ডেভেলপার ইমরান তার মেয়েদের ভালোবেসে কেক বানানো শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে রেড ভেলভেট কেক, হোমমেড ক্রিম চিজ ফ্রস্টিংসহ নানা কেকের কারিগর মূলত তিনি।

প্রতিদিন নতুন ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ করা, অর্ডার নেওয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট শেয়ার করা— সবই ওয়াসেকা এবং তার স্বামীর হাতে। ওয়াসেকা বলেন, ‘আমরা চাইনি কোনো তৃতীয় পক্ষ এই দায়িত্ব নিক। প্রতিটি কেক যেন আমাদের পরিবারের ভালোবাসা ও যত্নের সাক্ষ্য দেয়।’ সেই স্নেহময়ী স্পর্শের কারণে অনেক গ্রাহক কেক ফ্রিজ করে বিদেশেও নিয়ে যান বলে জানান তিনি।
বেকিংয়ের এই সফলতার পর ওয়াসেকা আরও একটি নতুন স্বপ্নের দিকে পা বাড়ান। জন্ম নেয় Decoupage With Waseca, যা শুধু হোম ডেকর বা হ্যান্ডিক্রাফটের বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য— বাংলাদেশি শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করা এবং সৃজনশীলতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করা।
ওয়াসেকার স্বপ্ন— প্রথমে লোকাল, পরে ন্যাশনাল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তারপর একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশি হ্যান্ডিক্রাফটের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। Decoupage With Waseca সেই বাজারে ‘Made in Bangladesh, Loved Worldwide’ ব্র্যান্ড ট্যাগের সঙ্গে জায়গা করে নেবে, এমন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
প্রতিটি হ্যান্ডমেড আইটেমে ওয়াসেকার নান্দনিক কল্পনা, সততা এবং যত্নের ছোঁয়া আছে। এখানে গ্রাহক শুধু প্রোডাক্ট কেনেন না— তারা কেনেন মুহূর্ত, স্মৃতি এবং ভালোবাসা। ওয়াসেকা জানাচ্ছেন, প্রতিটি আইটেমের সঙ্গে ছোট্ট গল্প বা আবেগ জুড়ে দেওয়া হয়। ‘এটি গ্রাহকের সঙ্গে আবেগের সেতুবন্ধন তৈরি করে। যখন তারা এই আইটেম ব্যবহার করে, মনে হয় আমরা তাদের জীবনে একটি ছোট্ট আনন্দ যোগ করেছি,’ বলেন তিনি।

শুধু গিফট নয়, হোম ডেকর, ফ্যাশন অ্যাক্সেসরিজ, কর্পোরেট গিফট, এমনকি ইভেন্ট ডেকর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
ডিজিটাল উপস্থিতি ওয়াসেকার উদ্যোগের আরেকটি শক্তি। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম থেকে শুরু করে ওয়েবসাইট এবং আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস— সব জায়গায় সঠিক ছবি, ভিডিও, রিল এবং গ্রাহকের রিভিউয়ের মাধ্যমে ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করা সম্ভব। ওয়াসেকা বলেন, ‘ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় এবং ব্র্যান্ডকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।’ এছাড়া ফ্যাশন ব্র্যান্ড, ক্যাফে বা কর্পোরেট হাউজের সঙ্গে সহযোগিতা (collaboration) দ্রুত বাজারে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি বৃদ্ধি করে। যেমন, কোনো কফিশপে ওয়াসেকার হ্যান্ডপেইন্টেড কেটলি ব্যবহার হলে সেই অভিজ্ঞতা অন্যান্য গ্রাহকদের আগ্রহ তৈরি করে।

ওয়াসেকা জানান, তাদের দুইটি উদ্যোগ— বাবা’স বেকিং জোন এবং Decoupage With Waseca— শুধু ব্যবসা নয়, বরং আবেগ, দায়বদ্ধতা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য মিশ্রণ। প্রতিটি কাজের পেছনে আছে স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং এক দারুণ উদ্দেশ্য— মানুষের জীবনে ছোট ছোট আনন্দ যোগ করা।

ওয়াসেকা এবং তার স্বামী স্বপ্ন দেখেন, দেশের প্রতিটি কোণায় তাদের উদ্যোগ পৌঁছাবে এবং একদিন বাংলাদেশের হ্যান্ডিক্রাফটের বিশ্বের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে স্বীকৃতি মিলবে।
ছোট ঘর থেকে শুরু হওয়া এই পরিবারিক উদ্যোগ সৃজনশীলতার এক সম্ভাবনাময় পরিসর তৈরি করেছে। কেকের ঘ্রাণে মিশে থাকা আবেগ, হ্যান্ডিক্রাফটের সৌন্দর্যে ভরা গল্প এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সংযোগ— সব মিলিয়ে এই যাত্রা হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত প্রমাণ।
ওয়াসেকা এবং ইমরান দম্পতি প্রমাণ করতে চান, সঠিক পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রম দিয়ে স্বপ্নকে বাস্তব করা যায়।