অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

দেশীয় ঐতিহ্যের সম্ভার নাহিমের ‘ধূরং’

ছোটবেলা থেকেই ছিলেন প্রচণ্ড ডানপিটে আর মেধাবী। কিন্তু সমাজের নিয়ম, পরিবারের চাপ আর বাল্যবিয়ের বেড়াজালে হারিয়ে গেল অনেক স্বপ্ন। মাধ্যমিক শেষ করতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল নাহিম আকতারকে। সংসারের নানা টানাপোড়েনে একসময় মনে হয়েছিল, এ জীবন কি তবে কেবলই চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকবে? সেখান থেকেই তার প্রশ্নের শুরু, আর খোঁজ শুরু নিজের নতুন করে দাঁড়িয়ে ওঠার।

রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুকে নাহিম নিজের উদ্যোক্তা জীবনের গল্প শুনিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

২০১৪ সালে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে নাহিম নামেন উদ্যোক্তার পথে। গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ধূরং, যেখানে দেশীয় পোশাক ও ঐতিহ্যই তার কাজের মূল অনুষঙ্গ। নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে নাহিম বলেন, ‘আমার উদ্যোগের মাধ্যমে আমি আমার দেশ ও আমার কাজকে তুলে ধরেছি। ছোট থেকে বড় হওয়ার স্বপ্ন, আর্থিক সক্ষমতা অর্জন আর সমাজে অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষাই আমাকে এগিয়ে নিয়েছে।’

No photo description available.

তবে এই যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথমদিকে স্বামী বা পরিবার থেকে বিশেষ সমর্থন পাননি তিনি। পরে তার অদম্য প্রচেষ্টা ও সাফল্য চোখে পড়লে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন সবাই। নাহিমের কথায়, ‘উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে প্রথম প্রতিবন্ধকতা আমার মেয়ে হয়ে জন্মানোটা। সংসার সামলে ব্যবসা চালানো খুব কষ্টের ছিল। তার ওপর চলতি মূলধনের অভাব, দক্ষ জনশক্তির সংকট, বিদেশি পণ্যের ভিড়, রাজনৈতিক অস্থিরতা— সব মিলিয়ে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।’

চ্যালেঞ্জ পেরোনোর গল্পও আছে তার। বারবার ভরসা করে মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছেন, ব্যবসার প্রাথমিক ভুল সিদ্ধান্তে লোকসান গুনতে হয়েছে। কিন্তু তবু হার মানেননি। তার ভাষায়, ‘কারখানা স্থাপন করার আগে শোরুম না নেওয়াটা ছিল আমার বড় ভুল। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। তবে মনোবল আর কাজের প্রতি ভালোবাসা আমাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি।’

No description available.

নাহিম বিশ্বাস করেন, কেবল পড়াশোনা করে সবাই উদ্যোক্তা হতে পারে না। ব্যবসা করতে হয় আগ্রহ, অধ্যবসায় আর দৃষ্টিভঙ্গির জোরে। তিনি বলেন, ‘যারা গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে কিছু করার সাহস করে তারাই ব্যবসা করতে পারে। তারাই দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। নতুন উদ্যোক্তাদের বলব, যে কাজটা আপনি ভালো পারেন, সেটিই শুরু করুন। দেখা-দেখি ব্যবসা করবেন না। আগে শিখুন, তারপর ছোট পরিসরে শুরু করুন— সফলতা আসবেই।’

ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে ধূরংকে তুলে ধরতে চান নাহিম। একই সঙ্গে নিজের এলাকার অনগ্রসর নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা গড়ার স্বপ্নও আছে তার। ‘আমার উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এর লক্ষ্য এক ও পাঁচের সঙ্গে যুক্ত থাকবে— দারিদ্র ও ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে এবং নারী-শিশুর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে,’ জানান তিনি।

No description available.

সংসারের চার দেওয়াল ভেঙে, সমাজের বাঁধা পেরিয়ে ধূরং আজ তার নতুন পরিচয়। স্থানীয় ঐতিহ্যের শাড়ি, থ্রি-পিস, শাল আর বিশেষ করে জামদানীর মতো পোশাকের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরছেন নাহিম আকতার।

No description available.

তিনি বললেন, ‘আমার চাওয়ার ৪০% পূরণ হলেও ৬০% এখনও অধরা। তবে স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে, আর আমি বিশ্বাস করি একদিন তা পূরণ হবেই।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত