
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শোক ও নিন্দা জানানো হলেও এনসিপি ও বিএনপিসহ বিভিন্ন পক্ষ আওয়ামী লীগের কর্মীদের দায়ী করছে।
অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, আখতার হোসেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনিম জারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সহযোগী ও সমর্থকেরাই এ হামলা করেছে বলে সরকারের অভিযোগ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই ঘটনা শেখ হাসিনার শাসনামলে গড়ে ওঠা সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি। সরকার দাবি করেছে, ভিভিআইপি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় বিকল্প পথ ব্যবহার করায় ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নিউইয়র্ক পুলিশ এবং তদন্ত চলছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক সঞ্জীবন সরকার জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তাকে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আক্রমণমূলক আচরণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে।
এনসিপি নেতারা এ ঘটনাকে ‘দূতাবাসের অব্যবস্থাপনা’র ফল বলে দাবি করেছেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনিম জারা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এটি ব্যক্তি আখতার হোসেনের ওপর আক্রমণ নয়, তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে করা হয়েছে। এই হামলা প্রমাণ করে পরাজিত শক্তির ভয় ও হতাশা কতটা গভীর।’
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মূখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদও ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এটা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। জাতীয় নেতাদের নিরাপত্তা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।’
ঘটনার পর আখতার হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা সেই প্রজন্ম যারা হাসিনার গুলির সামনে মাথা নত করিনি। ভাঙা ডিমে কিছু যায় আসে না। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হলো আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন।’
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, আখতার হোসেন বিএনপি ও এনসিপির কর্মীদের নিয়ে আওয়াজ তোলেন— ‘শেখ হাসিনার বিচার চাই’, ‘গণহত্যার বিচার চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে।
যদিও বিএনপি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে যা ঘটেছে, তা আবারও প্রমাণ করল, আওয়ামী লীগ তাদের অন্যায়ের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা করে না।’
মির্জা ফখরুল তার পোস্টে আরও লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আজ পর্যন্ত যা করেছে, সবকিছুর বিচার আইনের মাধ্যমে হবে। দল ও দেশের স্বার্থে ধৈর্য ধরুন।’
অপর দিকে এ ঘটনা নিয়ে হতাশ বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি নিয়ে আমি খুব বিব্রতবোধ করি না এজন্য বাংলাদেশের নেগেটিভ কালচারালটা আগে থেকেই হয়ে আসছিল। যখন কোনো সরকার প্রধান সফর করে বিরোধীদল যে থাকে তারা এসে স্লোগান দেয়। আমেরিকা গণতন্ত্রের দেশ, ১০-২০ জন এখানে এসে স্লোগান দিতে পারে, ডিম মারতে পারে। এটা একটা খারাপ কালচার।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, পুরো ঘটনার জন্য ব্যবস্থাপকদের অনেক কমিউনিকেশন গ্যাপ আছে বলে মনে করি। হাইকমিশনের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি আমরা একসঙ্গে বের হতাম তাহলে আওয়ামী লীগের সাধ্য ছিল না আমাদের ধারে কাছে আসার।
ঘটনার সময় বিমানবন্দরের বাইরে আগে থেকেই আওয়ামী লীগের কর্মীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন। তবে দলীয়ভাবে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি।
ঘটনার পরপরই প্রধান উপদেষ্টা ও সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
জেএফকে বিমানবন্দরের এই ঘটনা শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি মহলেও আলোচনার ঝড় তুলেছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনি পদক্ষেপের দিকে।