
ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম স্বপ্ন ছিল মাহমুদার। তিনি চিকিৎসক, উদ্যোক্তা এবং একইসাথে একজন গৃহিণী। তার স্বপ্ন কেবল নিজের উন্নতি নয়, বরং আশপাশের মানুষদের নিয়েও। এজন্যই গ্রাজুয়েশন শেষ করেও তিনি শুধু চাকরিতে মনোযোগী হতে পারেননি। জেনারেল পড়ালেখার পাশাপাশি করেছেন হোমিওপ্যাথি ডিপ্লোমা, চেম্বারও চালিয়েছেন। তবু কোথায় যেন এক অদম্য অস্থিরতা থেকে যাচ্ছিল— আরও কিছু করার, আরও অনেকের জন্য কিছু করার।
রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুকে মাহমুদা বলেছেন তার স্বপ্নযাত্রার গল্প। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।
করোনার আগে মাহমুদা স্বামী চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পাশাপাশি মাহমুদা অনলাইনে পিঠা বিক্রি শুরু করেন, দুইজনকে সঙ্গে নিয়ে। টুকটাক সাড়া মেলে, কিন্তু হঠাৎই আসে করোনা মহামারি। লকডাউনের অভিঘাতে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে সঞ্চয় করা টাকা শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হয় গ্রামের বাড়ি। পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই, তবে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর মানুষ কম ছিল না।
কিন্তু হার মানেননি মাহমুদা। নতুন করে ভাবলেন— কী করা যায়! মাত্র দুই হাজার টাকা হাতে নিয়ে কিনলেন কিছু কাঁচামাল। শুরু হলো চানাচুর আর চিড়া ভাজার কাজ। ছোট ছোট প্যাকেট বানিয়ে দোকানে দিতে লাগলেন। একটু সাড়া মিললেই পরের ধাপে গেলেন— চানাচুর, ডাল, মটর ভাজা, নিমকি। ধীরে ধীরে সেই ছোট্ট উদ্যোগ রূপ নিতে শুরু করল এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়।
আজ তার উদ্যোগে আছেন পাঁচ-ছয়জন কর্মী। স্বামীকে পাশে নিয়ে তিনি হোলসেল এবং রিটেইল দুইভাবেই বাজার ধরেছেন। প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত চানাচুর, ডাল, মটর, ছোলা ভাজা আর নিমকি বিক্রি করছেন। চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে, তবে মূলধনের সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে তার সিগনেচার পণ্যগুলো— স্পেশাল রসুনের চানাচুর, চিকেন চানাচুর, ঝাল চানাচুর, মিষ্টি চানাচুর আর চিড়া ভাজা। অনলাইনে ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার আচার সিরিজ, যার মধ্যে মাংসের আচার বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

মাহমুদার ভবিষ্যতের স্বপ্নও স্পষ্ট— নিজের তৈরি পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছাবে বিশ্ববাজারে। শুধু নিজের ব্যবসা নয়, গ্রামীণ নারীদের সম্ভাবনাকেও এগিয়ে নিতে চান মাহমুদা। তিনি জানেন অনেক নারী আছেন যারা দারুণ মানের পিঠা, আচার, মোরব্বা, জ্যামজেলি, কুমড়া বড়ি, পাঁপড়, কাসুন্দি বানাতে পারেন। অথচ বাজারজাত করার মতো সুযোগ তাদের নেই। সেইসব স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য বাজারে পৌঁছে দিয়ে তিনি যেমন ভোক্তাদের হাতে ভালো জিনিস তুলে দিতে চান, তেমনি কর্মসংস্থান তৈরি করতে চান গ্রামের অসহায় মানুষদের জন্য।
মাহমুদার চোখে একটাই স্বপ্ন— ‘আমি যেন আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি, আর আশপাশের মানুষদের জন্য কিছু করতে পারি।’