অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

মানুষ প্রতারণা করতে পারে, পরিশ্রম প্রতারণা করে না : ফাতেমা জেসমিন মৌ

‘একসময় আমি ২০ টাকা রিকশা ভাড়া স্বামীর কাছে হাত পেতে নিতাম। আজ আল্লাহর রহমতে সেই স্বামীর দুইটি অসম্পূর্ণ ফ্ল্যাট আমি নিজের উদ্যোগের টাকায় সম্পূর্ণ করেছি। এখন সেখান থেকে ভাড়া আসে, প্যাসিভ ইনকাম আসে। আর আমার সন্তানরা গর্ব করে বলে, তাদের মা একজন উদ্যোক্তা।’—গভীর আবেগ মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন Jufa Online Shop–এর উদ্যোক্তা ফাতেমা জেসমিন মৌ।

রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুকে মৌ বলেছেন তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

জীবনের শুরুটা ধর্মীয় আবহেই কেটেছে মৌ-এর। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন পর্দানশীল, ধর্মচর্চায় নিবেদিত। তাই কখনো ভেবেই দেখেননি বড় হয়ে তিনি উদ্যোক্তা হবেন। কিন্তু সময়, পরিস্থিতি আর পরিবারকে ঘিরে আসা অপ্রত্যাশিত সংকট তাকে বাধ্য করে নতুনভাবে ভাবতে।

অনার্সে ওঠার সময় বাবার ব্রেইন স্ট্রোক হয়, শরীরের এক পাশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। সংসারে তখন আর্থিকভাবে কেউ দাঁড়ানোর মতো ছিল না। ছোট ভাই আবাসিক মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতো, তার খরচও জোগাতে হতো। মা একাই সংসার চালাতেন— কিন্তু তা ছিল সীমাহীন কষ্টে ভরা। পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে মৌ তখন সিদ্ধান্ত নিলেন টিউশন করে কিছু উপার্জন করবেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর থেকে তিনি ঘরে বসে টিউশন শুরু করেন। বাইরে কোথাও পড়াতে যাওয়া বা চাকরি করা পরিবার কখনোই অনুমতি দেয়নি।

তবে টিউশনের সামান্য আয় দিয়ে সংসারের টানাপোড়েন মেটানো যেত না। মৌ-এর মনে তখনই জন্ম নেয় স্বপ্ন— একদিন নিজের বাড়ি হবে, নিজে অর্থ উপার্জন করবেন, আর সেই অর্থ দিয়ে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।

এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার পথে তাকে পাড়ি দিতে হয় অনেক প্রতিকূলতার। উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুতে তিনি নিজের দুই ছেলের নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে গড়ে তোলেন ‘Jufa Online Shop।’ কাপড়-চোপড় ছিল মূল পণ্য। গ্রাহকের বাসায় পৌঁছে দিতে গিয়ে প্রায়ই রাত আটটা পর্যন্ত বাইরে থাকতে হতো। কিন্তু এ নিয়ে সংসারে অসন্তোষ তৈরি হয়। বাবা-মা, স্বামী, শাশুড়ি— কেউই মেনে নিতেন না। শাশুড়ি ক্ষোভে বলতেন, ‘আমার কাপড় বিক্রি করার দরকার কী, শ্বশুরবাড়িতে তো ভালোই আছি।’ স্বামীও প্রায়ই অভিযোগ তুলতেন— তিনি সংসারের কাজে মনোযোগ দিচ্ছেন না। এমনকি একবার বাবা রাগে বলে ফেলেন— ‘তুমি আমার মেয়ে নও।’

মৌ-এর কষ্ট বাড়তে থাকে। শাশুড়ির বকাঝকা এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, একদিন রান্না বসাতে দেরি হওয়ায় তিনি বলেন, ‘তুমি রাস্তায় মরে যাও না কেন?’ এমন কটুকথা মৌ-এর ভেতরে গভীর আঘাত করে। তিনি ভাবতে থাকেন— আল্লাহ না করে যদি সত্যিই এরকম কিছু ঘটে যায়! একসময় এসব কথার আঘাত সহ্য করতে না পেরে কয়েকদিনের জন্য নিজের বোনের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে মা তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিলেও শাশুড়ির রাগ তখনো কমেনি। তবে, মাস দুয়েক পর তার স্বামী শাশুড়ি থেকে আলাদা হয়ে তাকে বাসায় নিয়ে যান।

করোনার সময় স্বামীর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারে তখন নতুন সংকট। মৌ সাহস করে এগিয়ে আসেন। স্বামীর দুটি অসম্পূর্ণ ফ্ল্যাটের একটিতে তখন থাকতেন তারা। অসম্পূর্ণ ফ্ল্যাটকে বাসযোগ্য করে তুলতে নিজেই কারেন্টের সংযোগ থেকে শুরু করে ত্রিপল বিছানো পর্যন্ত— সবরকম কাজ করান। শুধু তাই নয়, আরেকটি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার মতো করে তুলতে মা ও বোনের কাছ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা ধার নেন। আশা করেছিলেন, স্বামী তো টাকা ফেরত দিয়েই দেবেন। কিন্তু স্বামীর ব্যবসা বন্ধ থাকায় তা তখন সম্ভব হয়নি। তাই নিজের উদ্যোগের আয় থেকেই কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করেন মৌ।

তিনি গর্ব করে বলেন, ‘যে মেয়ে একসময় ২০ টাকা ভাড়ার জন্য স্বামীর কাছে হাত পাততো, সেই মেয়ে আজ নিজের আয়ে স্বামীর দুইটা ফ্ল্যাট কমপ্লিট করে দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, এখন সেখান থেকে ভাড়া পাওয়া যায়, যা আমার পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ হয়ে আছে।’

তবে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৯ সালে তিনি প্রতারণার শিকার হন। ফেসবুকে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি নিজেকে সচিব পরিবারের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখান। ভাগ্নির জামাইকে চাকরি দেওয়ার জন্য তিনি মৌ-এর কাছে জামানত চান। বিশ্বাস করে মৌ নিজের স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে টাকা দেন। প্রথমে ৩০ হাজার, পরে আরও কিস্তিতে ৮০ হাজার টাকা পাঠান বিকাশে। কিন্তু চাকরি হয়নি, বরং টাকা নিয়েই উধাও হন সেই ব্যক্তি। এমনকি ভাগ্নির জামাই-ও বিশ্বাস ভেঙে মৌ-এর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি। একসময় মৌ বুঝলেন— প্রতারিত হয়েছেন।

এই ঘটনায় শুধু আর্থিক ক্ষতি হয়নি, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু থেমে যাননি। বরং আবার কাজ শুরু করেন, কষ্ট করে নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নেন।

আজ তার সন্তানরা গর্ব করে বলে— ‘আমাদের মা একজন উদ্যোক্তা।’ স্বামীও এখন আর বাধা দেন না।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে মৌ-এর বলেন, ‘আপনার যেটাতে আগ্রহ, সেটাতেই ফোকাস করুন। ধৈর্য ধরুন, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। মানুষ প্রতারণা করতে পারে, কিন্তু নিজের পরিশ্রম কখনোই প্রতারণা করে না। প্রতিভা না থাকলেও অন্যের পণ্য রিসেলিং দিয়ে শুরু করা যায়। এতে অভিজ্ঞতা হবে, ইনকাম হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে।’

তার মূলমন্ত্র— কম দামে, কম প্রফিটে পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি চান, দেশের সর্বস্তরের মানুষ যেন সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে।

সংসার, সমাজ আর আত্মীয়-স্বজনের বাঁধা পেরিয়ে ফাতেমা জেসমিন মৌ আজ প্রমাণ করেছেন— ‘আমরা নারী, আমরাও পারি।”

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত