বিদেশ, লিড নিউজ

বিদেশ, লিড নিউজ

ফ্লোটিলার শেষ জাহাজও আটক করল ইসরায়েল, দেশে দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া

গাজার ওপর আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ভাঙতে যাওয়া বিশাল ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-এর সর্বশেষ জাহাজটিও আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবার ভোরে ‘দ্য ম্যারিনেট’ নামের পোল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক করা হয়। ছয়জন ক্রুসহ এ নৌযানটি গাজার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছিল। সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ইসরায়েলি নৌসেনারা অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় জোর করে জাহাজে উঠে নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ফ্লোটিলা আয়োজকদের দাবি, শেষ পর্যায়ে থাকা এই জাহাজটিও আটক করার মাধ্যমে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। তারা জানায়, আটক হওয়ার মুহূর্ত থেকেই কয়েকজন কর্মী অনশন শুরু করেছেন। এর আগে বুধবার থেকে শুরু করে প্রায় ৪০টিরও বেশি নৌযান আটক করা হয় এবং অন্তত ৪৪৩ জন কর্মী গ্রেপ্তার হন। আটক হওয়া কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন সুপরিচিত জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থানবার্গ, বার্সেলোনার সাবেক মেয়র আদা কলাউ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রিমা হাসান। তাদের সবাইকে ইসরায়েলে নেওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তীতে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

ইসরায়েলের দাবি, নৌবাহিনী নৌযানগুলোকে আগেই সতর্ক করেছিল যে তারা ‘সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে প্রবেশ করছে এবং বৈধ নৌ অবরোধ ভঙ্গ করছে।’ তবে ফ্লোটিলা আয়োজকরা একে অবৈধ ও আগ্রাসী পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এটি প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং মরিয়া হয়ে নেওয়া একতরফা আগ্রাসন।

বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার টুর্ক ইসরায়েলকে অবিলম্বে গাজার অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জীবন রক্ষাকারী উপকরণ ও মানবিক সহায়তা যেন কোনো বাধা ছাড়া গাজায় পৌঁছাতে পারে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজে ইসরায়েলের এ অভিযানকে ‘অবৈধ অপহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো প্রতিবাদে তার দেশে থাকা সব ইসরায়েলি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছেন এবং দুই দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের কাছে আটক ব্যক্তিদের অধিকার সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছে।

আইরিশ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস ঘটনাটিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, অন্তত সাতজন আইরিশ নাগরিকের আটক হওয়া মেনে নেওয়া যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা দেশটির নাগরিকদের দ্রুত মুক্তি দাবি করেছেন, যাদের মধ্যে নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি নকোসি জুয়েলেভেলিল ম্যান্ডেলাও রয়েছেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, গাজার ওপর ইসরায়েলের অবরোধ দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ। আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের দায়মুক্তি এবার বন্ধ হতে হবে।

ফিলিস্তিনের সমর্থনে লন্ডনে বিক্ষোভ

বিক্ষোভ-সমাবেশ ও ধর্মঘট

ফ্লোটিলা আটকের পর ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। ডাবলিন, প্যারিস, বার্লিন, জেনেভা, বুয়েনস আইরেস, মেক্সিকো সিটি ও করাচিতে হাজারো মানুষ ফিলিস্তিনপন্থি মিছিল করেছে। ইতালিতে শুক্রবার সাধারণ ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দিয়েছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো।

গাজার মানবিক সঙ্কট

আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, গাজায় ইতোমধ্যেই দুর্ভিক্ষ চলছে। জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি (ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন) গত মাসে নিশ্চিত করেছে যে গাজার কয়েকটি অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক প্রধান অভিযোগ করেছেন, এটি ইসরায়েলের পদ্ধতিগতভাবে সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার সরাসরি ফলাফল। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আরও প্রচেষ্টার ঘোষণা

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার আইনি সহায়তা প্রদানকারী দল জানিয়েছে, এ ব্যর্থতা সত্ত্বেও আগামী দিনে গাজার অবরোধ ভাঙতে আরও প্রচেষ্টা হবে। তারা বলছে, সর্বোচ্চ ১৩টি নতুন নৌযান নিয়ে আরেকটি বহর প্রস্তুত করা হচ্ছে, যার নেতৃত্ব দেবে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন।

এত বড় আকারে আন্তর্জাতিক মানবিক ত্রাণবহর আগে কখনো গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেনি। ফ্লোটিলা আটকের ঘটনায় ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়ে গেল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত