অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

সাহস ও ধৈর্য থাকলে পথ তৈরি হয় : ফারজানা রহমান

সংসার, সন্তান সামলিয়ে নিজের ভেতরের অদম্য ইচ্ছের জোরে দাঁড় করিয়েছেন নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান— ‘সদাইঘর’। উদ্যোক্তা ফারজানা রহমান বলেন, ‘চাকরি করার ইচ্ছা ছিল না, কারণ সংসার আর বাচ্চাদের নিয়ে সময় দেওয়াটা চাকরির মধ্যে সম্ভব হচ্ছিল না। তাই নিজের কিছু করার কথা ভাবলাম। ছোট থেকেই স্বাধীনভাবে কিছু করার একটা টান ছিল।’

রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুকে সদাইঘরের ফারজানা বলেছেন তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

ফারজানার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর, কেননা, ইতোমধ্যে তার ঝুলিতে জমেছে অনেকটা পথ চলার অভিজ্ঞতা। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে সেই অপূর্ণতাই আজ তাকে দিয়েছে নতুন এক পরিচয়। ‘শিক্ষক হতে পারিনি, কিন্তু এখন এমন কিছু করতে চাই, যাতে সবাই আমাকে চেনে, জানে— আমার একটা পরিচয় হয়,’ বলেন তিনি।

‘সদাইঘর’-এর শুরুটা ছিল ছোট করে, ঘরোয়া আঙ্গিকে। কিন্তু আজ তা ফারজানার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্র্যান্ডে এখন নানা পণ্য রয়েছে— শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, ব্যাগ, বিছানার চাদর, গয়না, কসমেটিকস, শাল— সবই। মেয়েদের ও ছেলেদের জন্য আলাদা পণ্য রাখি, যেন সবাই নিজের পছন্দের কিছু খুঁজে পায়।’

উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পারিবারিক সমর্থন পেয়েছেন আংশিকভাবে। ‘আমার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে পারিবারিক সমর্থন পুরোপুরি ছিল। কিন্তু সহযোগিতা কিছু ক্ষেত্রে পেয়েছি, বেশিরভাগ সময় পাইনি,’ বলেন ফারজানা রহমান। বাধা, প্রতিবন্ধকতা ছিল পদে পদে। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা হওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছে। এখনো সেসব মোকাবিলা করছি, ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। ইনশাআল্লাহ সামনে নিশ্চয় ভালো কিছু করতে পারব।’

ফারজানা মনে করেন, সফলতার পেছনে লুকিয়ে থাকে ব্যর্থতার গল্পও। ‘এখনো পুরোপুরি সফল নই, তবে ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। ব্যর্থতা তো অবশ্যই আছে—ব্যর্থতা ছাড়া কোনো কাজ সঠিকভাবে করা সম্ভব নয়। সেখান থেকে শিখেছি, নিজের কিছু করতে হয়, নিজের পরিচয় নিজেকেই তৈরি করতে হয়। পরিশ্রম করতে হয়, কারণ পরিশ্রমের মাধ্যমেই সফলতা আসে,’ বলেন তিনি।

চাকরি খোঁজা তরুণদের উদ্দেশে ফারজানার পরামর্শ, ‘চাকরি না খুঁজে নিজের কিছু করা উচিত। এতে নিজের আত্মসম্মান বজায় থাকে। অন্যের চাকরি করলে নিজের স্বাধীনতা থাকে না। ছোট হোক বা বড়, নিজে কিছু করা উচিত।’

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তার উপদেশ, ‘যে কাজটি করতে চায়, সেটি নিয়ে স্পষ্ট চিন্তা থাকতে হবে। যে কোনো উদ্যোগের জন্য কিছু ইনভেস্টমেন্ট দরকার— তারা যতটুকু পারবে, ততটুকু নিয়েই শুরু করা উচিত। সাহস আর ধৈর্য থাকলে পথ তৈরি হয়।’

ফারজানা বিশ্বাস করেন, একজন নারী উদ্যোক্তার সাফল্য অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। ‘আমাকে দেখে হয়তো আর চার-পাঁচজন নিজে কিছু করার আগ্রহ পাবে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে। একজন নারীকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া খুব জরুরি,’ বলেন তিনি।

নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করার স্বপ্নও তাঁর চোখে স্পষ্ট। “আমি আমার ছোট উদ্যোগটাকে বড় করতে চাই। যেন এখান থেকে আরও চার-পাঁচজন ইনকাম করতে পারে, নিজেদের সংসার সচল রাখতে পারে,” বলেন তিনি দৃঢ়তায় ভরা কণ্ঠে।

দেশের জন্য তার ভাবনা ও অবদান নিয়েও ফারজানার এক গভীর উপলব্ধি আছে। ‘আমার মাধ্যমে যদি কারও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে— এই বিশ্বাসেই কাজ করছি।’

সংসার, সন্তান ও স্বপ্ন— এই তিনের ভারসাম্যে নিজের পৃথিবী তৈরি করেছেন ফারজানা রহমান। তার ‘সদাইঘর’ একটি অনলাইন ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার চেষ্টার সাথে সাথে নারীর সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক হওয়ার প্রয়াসে কাজ করে যাচ্ছে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত