নির্বাচিত, সম্পাদকীয়

নির্বাচিত, সম্পাদকীয়

স্বর্ণময়ীরা মরে যায়, আলতাফরা টিকে থাকে

২৬ বছর বয়সী ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার সৃষ্টিশীল তরুণী স্বর্ণময়ী বিশ্বাস। তিনি আর নেই! এই অল্প বয়সে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টাতে, এক সৃজনশীল তরুণী নিজের জীবনের পরিসমাপ্তি নিজে টেনে দিলেন। তার সাদাকালো ছবির মৃদু হাসিটা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে— একটি মেয়ে, যে একসময় রঙে রঙে সাজাতো নিউজ প্লাটফর্মের দেয়াল, এখন হয়ে গেছে অনন্ত শূন্যতার প্রতীক। কেন এমন হলো? কে দায় নেবে এই মৃত্যুর?

সবাই এখন বলছে, হয়তো মানসিক চাপ, হয়তো পারিবারিক জটিলতা, হয়তো ব্যক্তিগত দুঃখ— হাজারটা ‘হয়তো’। কিন্তু আমরা জানি, ‘হয়তো’র আড়ালে একটা নিশ্চিত সত্য লুকিয়ে থাকে— স্বর্ণময়ী বিশ্বাস এক অসুস্থ কর্মপরিবেশে নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। ঢাকা স্ট্রিম নামে নতুন একটি সংবাদ মাধ্যমে তিনি ছিলেন। সেই অফিসে, কোনো এক ব্যক্তির বিষাক্ত আচরণ নারী সহকর্মীদের শ্বাসরোধ করে দিয়েছিল। ব্যক্তিটির নাম আলতাফ শাহনেওয়াজ।

আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পেশাগত কোনো কারণ ছাড়াই ‘গভীররাতে’ নারী সহকর্মীদের ফোন দেন তিনি। সিঁড়িতে আলাদা ডেকে কথা বলতেন। ছেলেবন্ধু আছে কি না, থাকলে তার সাথে সম্পর্ক কতখানি গভীর, শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে কি না— এমনসব ব্যক্তিগত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন।

নতুন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেকে সেখানে নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ শুরু করেছেন। এমন নারী কর্মীদের গভীররাতে ফোন করে আলতাফ বলতেন, ‘ঠিকঠাক কাজ না করলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না’।

তাছাড়া অফিসে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নারীদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতেন। এমননি মেজাজ হারিয়ে নারী সহকর্মীদের সাথে চিৎকার-চেঁচামেচিও করতেন।

এই আলতাফরা শুধু একজন ব্যক্তি নয়, তারা এক মানসিকতা— যে মানসিকতা ক্ষমতা, পদের দাপট আর পুরুষতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ববোধে ভরপুর। তারা ভাবে, নারী সহকর্মী মানে তার সাথে যা খুশি করা যায়। তাকে অপমান করে, ছোট করে, যৌন হেনস্থার শিকার করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানো যায়। তারা ভাবেই না, একটা খারাপ শব্দ, একটা কু-ইঙ্গিত, একটা বাজে মন্তব্য একজন নারীর আত্মমর্যাদাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে।

স্বর্ণময়ী বিশ্বাসসহ ২৬ জন সহকর্মী এই বিষাক্ত আচরণের জন্য আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তারপর? ঢাকা স্ট্রিম, ‘আধুনিক’, ‘পেশাদার’ প্রতিষ্ঠান বলে যারা নিজেদেরকে দাবি করে, তারা কী করল? তারা অভিযুক্তকে ‘বার্তাকক্ষ থেকে প্রত্যাহার’ করল— কাগজে কলমে। বাস্তবে সেই মানুষটাই থেকে গেল ক্ষমতার কেন্দ্রে। আর যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল প্রতিবাদী, তাদের কয়েকজনের চাকরি গেল, মূল্যায়নে ‘অসন্তোষজনক’ হয়ে গেলেন তারা।

বাংলাদেশে এটা নতুন কিছু নয়। এখানকার অনেক কর্মক্ষেত্রই নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। কিন্তু আরও ভয়ংকর হলো, অভিযোগের পরের নীরবতা। আমরা বারবার দেখি— একজন নারী প্রতিবাদ করে, অভিযোগ করে, তারপর ধীরে ধীরে সব নিঃশব্দ হয়ে যায়। কারণ চারপাশের মানুষ বলে, ‘এতে অফিসের নাম খারাপ হবে’, ‘তুমি অতিরঞ্জিত করছো’, ‘এইসব নিয়ে ঝামেলা কোরো না’। আর সেই নীরবতার মধ্যেই একজন স্বর্ণময়ী বিশ্বাস নিজের ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দেয়।

বাংলাদেশে উচ্চ আদালত ২০০৯ সালে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকতে হবে, বাইরের সদস্যসহ তদন্ত হবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠান কি সেই নির্দেশ মানে? ইউনেস্কো ও ডয়চেভেলের গণমাধ্যম সক্ষমতা গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ গণমাধ্যমে এমন কমিটি নেই। নেই অভিযোগ শোনার, তদন্ত করার, ন্যায়বিচার দেওয়ার কোনো কাঠামো।

এই ব্যর্থতাই স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর পেছনের আসল অপরাধী। এই ব্যর্থতাই আলতাফদের বাঁচিয়ে রাখে, শক্ত করে দেয় তাদের আসন। তাদেরকে আবারও কোনো স্বর্ণময়ীকে উত্যক্ত করার প্ররোচনা দেয়। এই ব্যর্থতাই একের পর এক নারীকে নিঃশেষ করে দেয়— কখনো আত্মহত্যায়, কখনো নীরবতায়।

আমাদের নিষ্ক্রিয়তার দায় নিয়ে চলে যায় স্বর্ণময়ীরা। আমাদের সমাজ, কর্মক্ষেত্র, বিচারব্যবস্থা— সব মিলিয়ে আমরা তাকে ঠেলে দেই আত্মহননের পথে।

স্বর্ণময়ীরা মরে যায়, কারণ তাদের বাঁচিয়ে রাখার সিস্টেম নেই। আলতাফরা টিকে যায়, কারণ তাদের রক্ষা করার সিস্টেম আছে। তারা ম্যানেজমেন্টের প্রিয়, সম্পাদকীয় টেবিল বা সিদ্ধান্ত নির্মাতা চক্রের সদস্য। তারা জানে— যত অভিযোগই উঠুক, শেষমেশ তাদের কিছুই হবে না।

কিন্তু যদি আমরা সত্যিই কিছু পরিবর্তন চাই, তাহলে এখনই দরকার এই আলতাফদের নাম, চেহারা, আচরণ সমাজের সামনে আনা। দরকার কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। দরকার নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইচ্ছাশক্তি।

স্বর্ণময়ী বিশ্বাসকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। কিন্তু আমরা পারি— পরবর্তী স্বর্ণময়ীকে হারানো থেকে বিরত থাকতে। আমরা পারি— কোনো অফিস, কোনো নিউজরুম, কোনো আলতাফকে আর কাউকে মেরে ফেলতে না দিতে।

যেদিন আমাদের প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে একজন নারী নির্ভয়ে কাজ করতে পারবে, যেদিন সে জানবে— অভিযোগ জানালে তার চাকরি যাবে না, বরং অপরাধীর বিচার হবে, সেদিনই আমরা বলতে পারবো— স্বর্ণময়ীরা আর মরে না, আলতাফরা আর টিকতে পারবে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
    গত ৭ দিনের কোনো জনপ্রিয় খবর পাওয়া যায় নি।