অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

১০ হাজার কর্মসংস্থান গড়ার স্বপ্নে এগিয়ে চলেছেন পাপ্পু

ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। পরিবারও চেয়েছিল ছেলেটা সরকারি চাকরি করুক, সমাজে প্রতিষ্ঠা পাক। কিন্তু শরিফ আহমেদ পাপ্পু পরে ভাবলেন— চাকরির সামান্য বেতনে হয়তো নিজের সংসার চলবে, কিন্তু সমাজ বদলাবে না। তাই একসময় নিজের ভেতরে প্রশ্ন জাগল, ‘আমি কি আর সবার মতো চাকরির পেছনে ছুটব, নাকি অন্যের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করব?’ সেই প্রশ্নের উত্তরই তাকে বানিয়েছে উদ্যোক্তা।

রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুর কাছে শরিফ আহমেদ পাপ্পু তুলে ধরেন তার মাস্টার ফ্যাশন প্রতিষ্ঠার গল্প, সংগ্রাম আর স্বপ্নের কথা। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

‘আমি দেশের মানুষকে সেবা করার জন্যও, বাংলাদেশের বেকারত্ব দূর করার জন্যও উদ্যোক্তা হয়েছি,’— বলেন উদ্যোক্তা পাপ্পু। তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে তৃপ্তি ও সংগ্রামের গল্প।

শুরুটা ছিল একেবারেই একা। পরিবার তখনও বিশ্বাস করত না, পাপ্পুর পক্ষে কিছু করা সম্ভব। “তারা বলত, ‘তুই পারবি না।’ কিন্তু সেই কথাই আমার চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। আমি প্রমাণ করতে চেয়েছি, পারব, অবশ্যই পারব,” বলেন তিনি।

পাপ্পুর উদ্যোক্তা জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন ‘নিজের বলার মতো গল্প’ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার জাহিদ। সেই ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণেই তিনি শিখেছেন কিভাবে হতাশা জয় করতে হয়, ব্যর্থতা থেকে নতুনভাবে দাঁড়াতে হয়, আর নিজের ব্যবসাকে উন্নতির পথে নিতে হয়।

তবে সাফল্যের আগে ছিল ব্যর্থতার দীর্ঘ অধ্যায়। প্রথম ব্যবসায় ভুল করেছিলেন পণ্য নির্বাচনে। ‘ঢাকার চকবাজার থেকে প্রোডাক্ট কিনে বিক্রির চেষ্টা করি। পরে দেখি, মান ভালো না। তখন নিজেকে প্রশ্ন করলাম— আমি কি টাকা দিয়ে খারাপ পণ্য কিনব? উত্তর ছিল না।’

এরপর আবার নতুন করে শুরু করেন। এবার পণ্যের গুণমান, বাজারের চাহিদা, গ্রাহকের রুচি— সব কিছু নিয়েই গবেষণা শুরু। নিজে থেকেই শিখেছেন মার্কেটিং, সেলস, ও ব্র্যান্ডিং। বলেন, ‘আমি তখন বুঝলাম, আগে শিখতে হবে। না জেনে ঝাঁপ দিলে আবারও হারব।’

‘মাস্টার ফ্যাশন’ এখন তার গর্বের নাম। যদিও এখনও বড় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি, কিন্তু পাপ্পুর চোখে এর ভবিষ্যৎ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমি চাই, আমার প্রতিষ্ঠান একদিন বড় গার্মেন্টস হোক— যেখানে অন্তত ১০ হাজার মানুষ কাজ করবে।’

তবে শুধু ব্যবসা নয়, সমাজকর্মও তার নিয়মিত কাজের অংশ। নিজের এলাকায় তিনি গাছ লাগান, ভাঙা রাস্তা মেরামত করেন, আর তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেন। ‘আমি চাই তরুণেরা চাকরির পিছনে না ঘুরে নিজের কাজ শুরু করুক। উদ্যোক্তা হলে শুধু নিজের রিজিক হয় না, আরও কয়েকটা পরিবারের রিজিকের ব্যবস্থা হয়,’ বলেন পাপ্পু।

নতুনদের জন্য তার পরামর্শ— স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘স্কিল শেখো, কথা বলার অভ্যাস গড়ো, যোগাযোগ বাড়াও, প্রেজেন্টেশন স্কিল উন্নত করো। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো উদ্যোগ নাও। তখন রিস্কও কম, শেখার সুযোগও বেশি।’

স্বপ্নের পথে এই লড়াই আজও চলছে। নিজের অবস্থান থেকে তিনি বিশ্বাস করেন, উদ্যোক্তারাই বেকারত্ব ঘুচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন। আর এই বিশ্বাসেই এগিয়ে যাচ্ছেন শরিফ আহমেদ পাপ্পু, এক হাতে ব্যবসা, অন্য হাতে সমাজ পরিবর্তনের কাজ নিয়ে।

‘বাংলাদেশকে উন্নত করতে আমি আমার সর্বোচ্চটা দিতে চাই,’— বললেন তিনি, মনে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি নিয়ে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত