অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

অর্থ ও বাণিজ্য, নির্বাচিত

‘হারানোর বেদনা’ থেকে স্বপ্নের কল্পতরু

শৈশব থেকেই সেলাইয়ের প্রতি আলাদা টান ছিল মাহফুজা আহমেদ মুনার। নিজের পোশাকে নকশার কাজ করা, মায়ের শাড়িতে হাতের কাজ—এই ছোট ছোট কাজ দিয়েই তৈরি হচ্ছিল ভবিষ্যতের এক সৃজনশীল পথচলা। তখন তিনি ভাবেননি, এই হাতের কাজ একদিন তাকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত করবে।

রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুর কাছে মুনা তুলে ধরেন তার ‘MC Kolpotoru’র গল্প, সংগ্রাম আর স্বপ্নের কথা। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

মুনার বড় বোন নুরজাহান সোমা ছিলেন দক্ষ টেইলার্স। দুই বোনের সেই দক্ষতার সম্মিলনে ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে ‘জননী লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড বুটিক হাউস’। দোকানে টেইলার্সের কাজ করতেন সোমা, আর বুটিকের নকশা ও হাতের কাজ সামলাতেন মুনা। টানা পাঁচ বছর ভালোই চলছিল তাদের প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু ২০১৫ সালে মুনার মা মারা যাওয়ার পর বদলে যেতে থাকে সবকিছু। শোকের রেশ কাটতে না কাটতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন বড় বোন। চিকিৎসা শেষে জানা যায়— দুটি কিডনিই বিকল। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালে মারা যান নুরজাহান সোমা। সেখানেই থেমে যায় জননী লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড বুটিক হাউসের পথচলা।

বোনকে হারানোর শোকের সঙ্গে থেমে যায় মুনার বুটিকের কাজও। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষিকা হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণ হয় ২০১৩ সালে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাত্রাবাড়ী ব্র্যাক কর্মসূচির একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিকা হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। স্কুলের চাকরির পাশাপাশি সীমিত পরিসরে বুটিকের কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এরপর আসে করোনা। লকডাউনে স্কুল বন্ধ, জীবন থমকে যায়। সেই সময় একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে মোবাইল ফোন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হন বাংলাদেশ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গ্রুপে। সভাপতি মো. আজিজুর রহমান আজিজসহ অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের কাজ ও পরামর্শ নিয়মিত অনুসরণ করতে থাকেন। ধীরে ধীরে আবার অর্ডার নেওয়া শুরু করেন।

সেই সময়ই অনলাইনে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার সিদ্ধান্ত নেন মুনা। নাম রাখেন ‘MC Kolpotoru’। নামটি পরিকল্পনা করে নয়, ভালো লাগা থেকেই রাখা। MC অর্থ ‘মুনা কালেকশন’, আর ‘কল্পতরু’— স্বপ্ন পূরণের প্রতীক।

এই উদ্যোগই বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। বাংলাদেশ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সদস্যদের মাধ্যমে পরিচিতি বাড়তে থাকে। আসতে থাকে নিয়মিত অর্ডার। দেশ ছাড়িয়ে তার হাতের কাজ পৌঁছে যায় দুবাই, মালয়েশিয়া ও ইংল্যান্ডে। এখান থেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হন মাহফুজা আহমেদ মুনা।

তবে পথটা সহজ ছিল না। ২০১৯ সালে MC Kolpotoru যাত্রা শুরুর সময় পরিবার থেকে তেমন কোনো সমর্থন বা সহযোগিতা পাননি তিনি। উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনাটাও তখন ছিল অনিচ্ছাকৃত। তার ভাষায়, জননী লেডিস টেইলার্স মূলত ছিল বোনের স্বপ্ন, আর বুটিক ছিল তার নেশা।

ব্যবসায়িক পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি দেখেছেন কিছু উদ্যোক্তার হিংসাত্মক মনোভাব। তবে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের পরামর্শ মেনে ধৈর্য ধরে কাজ এগিয়ে নেন তিনি। দলগতভাবে ব্যবসা শুরু করে একবার ব্যর্থও হন। মতানৈক্য, সমন্বয়হীনতা ও অদক্ষতার কারণে সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়, হয় আর্থিক ক্ষতি। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করে আবার নতুনভাবে শুরু করেন।

মুনা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে ‘চাকরি করব না, চাকরি দেব’— এই মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইন প্রশিক্ষণ নেওয়া, ছোট পরিসরে বিক্রি শুরু করা এবং নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তিনি।

কাজের চাপ বাড়লে তিনি আশপাশের নারীদের যুক্ত করেন। বাসার কাজের সহকারীকে নিজ হাতে কাজ শিখিয়ে দেন। সেই নারী আবার আরও দুজনকে যুক্ত করেন। যারা আগে বাড়ি বাড়ি কাজ করতেন, আজ তারা হাতের কাজের মাধ্যমে আয়ের পথ খুঁজে পাচ্ছেন। মুনার বিশ্বাস, এই নারীরাও একদিন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, একজন উদ্যোক্তার জন্য লিখিত পরিকল্পনা জরুরি— লক্ষ্য নির্ধারণ, বাজার গবেষণা, ব্যবসায়িক মডেল ও ব্র্যান্ডিং সবই এর অংশ।

সবচেয়ে বড় স্বপ্ন— সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। মুনা মনে করেন, এই মেয়েরাই একদিন দেশের জন্য বড় অবদান রাখবে। সেই পথচলায় পাশে থাকতে চান তিনি।

হারানোর বেদনা, একাকিত্ব আর প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা MC Kolpotoru আজ শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়— এটি আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য আর স্বপ্নের এক জীবন্ত কল্পতরু।

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত