
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা কেবল ডিগ্রিধারী মানুষ ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন নৈতিকভাবে সাহসী, সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্ববান নাগরিক। আজ প্রশ্ন ওঠে— আমরা কি সেই নৈতিক সাহসকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি, নাকি ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটিকেই ধীরে ধীরে সুবিধাবাদী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি?
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর শোকের দিন। স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের ঠিক প্রাক্কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দেশীয় দোসর আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও লেখকদের হত্যা করে। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল— নবজাত রাষ্ট্র বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়া।
রায়েরবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে অসংখ্য বুদ্ধিজীবী নির্মমভাবে নিহত হন— যাঁদের মধ্যে শহীদুল্লা কায়সার, মুনীর চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব প্রমুখ ছিলেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত জীবননাশ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত নীলনকশা— যাতে বাংলাদেশ আর কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে।
এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সময় আন্তর্জাতিক বিশ্ব ছিল প্রায় নীরব দর্শক। কিছু সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেলেও কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। এই নীরবতা আমাদের একটি নির্মম সত্য শেখায়— নিজের বুদ্ধিজীবী, নিজের বিবেক রক্ষা করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।
আজকের বাংলাদেশ : অগ্রগতি ও অসমাপ্ত চ্যালেঞ্জ
পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ অবকাঠামো (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল), শিক্ষা (সাক্ষরতার হার ৭৫% ছাড়িয়েছে) এবং অর্থনীতিতে (দারিদ্র্য ৮০% থেকে ১৮.৭%-এ নেমে এসেছে) দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবু ১৪ ডিসেম্বরের মূল প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত— আমরা কি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নৈতিক সাহস ও সত্যনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আজও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বিধিনিষেধ এবং তোষামোদনির্ভর সংস্কৃতি অনেক সময় সত্যভাষীদের একা করে দেয়। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যেন এক অদৃশ্য পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ— যা চোখে দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। আর সেই অনুভব করতে পারে মূলত তারাই, যাদের হৃদয়ে প্রকৃত দেশপ্রেম রয়েছে।
দায়িত্বের আহ্বান : স্বপ্ন পূরণের পথ
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সমগ্র বাংলাদেশের। তাঁদের রক্তের ঋণ শোধ হবে না কেবল স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে। এই ঋণ শোধ করতে হলে প্রয়োজন—
* সত্যনিষ্ঠ চিন্তার অবিরাম চর্চা।
* ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন।
* রাষ্ট্র পরিচালনায় জ্ঞান, মানবতা ও বিবেককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
* মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান নিশ্চিত করা।
১৪ ডিসেম্বর আমাদের শেখায়— শত্রু কেবল বন্দুক হাতে আসে না; সে আসে চিন্তা ধ্বংস করতে। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় লড়াই হলো সেই চিন্তাকে বাঁচিয়ে রাখা।
দুঃখজনকভাবে, আজকের প্রজন্মের একটি বড় অংশ ১৪ ডিসেম্বরকে কেবল একটি তারিখ হিসেবে জানে, উপলব্ধি হিসেবে নয়। স্মৃতি যখন কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি হয়ে যায়, তখন ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্ত করার সুযোগ পায়। যে রাষ্ট্র বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্নকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র ইতিহাস থেকে কিছুই শেখে না।
১৪ ডিসেম্বর আমাদের কেবল শোকের দিন নয়— এটি সাহসী হওয়ার নির্দেশ।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার দায় আমাদের সবার।