মত-অমত, সম্পাদকীয়

মত-অমত, সম্পাদকীয়

মধ্যবিত্তের ভাঙা অর্থনীতি : আয় আছে, নিরাপত্তা নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কিন্তু সবচেয়ে নীরব শ্রেণি হলো মধ্যবিত্ত। তারা দারিদ্র্যের তালিকায় নেই, আবার বিত্তের নিশ্চিন্ত ছায়াতলেও নেই। এই শ্রেণির মানুষদের আয় আছে, চাকরি আছে, কর্মব্যস্ততা আছে— কিন্তু নেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংকট আজ আর শুধুই ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। আয় বাড়ছে, কিন্তু নিশ্চয়তা কমছে; শুধু কমছে বলাও ভুল হবে, বরং বলা ভালো— তারা এখন পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবছে।

গত এক দশকে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের আয় কিছুটা বেড়েছে— এমন দাবি পরিসংখ্যানে পাওয়া যায়। কিন্তু একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম— সব মিলিয়ে আয় বাড়ার সুফল প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।

একসময় একটি মধ্যবিত্ত পরিবার মাসের শুরুতে আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকলেও মাসের শেষভাগে এসে পড়ত অনিশ্চয়তার মুখে। কিন্তু এখন মাসের শুরুতে আর স্বস্তি থাকে না। বেতনের টাকা হাতে আসার আগেই যেন ফুরিয়ে যায়। চাকরি থাকলেও চাকরির স্থায়িত্ব নেই।

বেসরকারি খাতে কর্মরত অধিকাংশ মানুষই জানেন— একটি ই-মেইল বা একটি সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ। যতই যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা থাকুক, তা মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

এখন আর সঞ্চয় নয়, টিকে থাকার হিসাব। আর সেটাও বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

একসময় মধ্যবিত্তের পরিচয় ছিল সঞ্চয়প্রবণতা। আজ সেই জায়গা দখল করেছে ‘ম্যানেজমেন্ট’। মাস শেষে কীভাবে কোন বিলটি সামাল দেওয়া যাবে, কোন খরচটি পিছিয়ে দেওয়া যাবে— এই হিসাবেই কাটে জীবন। তারপরও পেরে ওঠা যায় না।

হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা চাকরি হারানো— এই তিনটির যেকোনো একটিই একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ঠেলে দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে। সংকট কখনো কখনো এত তীব্র হয় যে, আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও থাকে না। স্বাস্থ্যবিমা বা অবসরভাতা এখনও এই শ্রেণির বড় অংশের কাছে বিলাসিতা হিসেবেই রয়ে গেছে। প্রতিদিনের খাবারের খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সঞ্চয় বা বিমা তো অনেক দূরের স্বপ্ন।

মধ্যবিত্তের সংকট সবচেয়ে ভয়ংকর হয় তার নীরবতায়। একে বলা যায় মর্যাদার চাপ। তারা প্রকাশ্যে কষ্টের কথা বলে না। ধার নেয়, কিন্তু মুখে হাসি রাখে। সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানে— এই উপস্থিতির মূল্য ভবিষ্যতে সুদে-আসলে দিতে হবে। সামাজিকতা রক্ষাও যেন তাদের কাছে গলার কাঁটার মতো।

এই শ্রেণি না পারে সহায়তা চাইতে, না পারে হাল ছেড়ে দিতে। সমাজ তাদের দেখে ‘সেটেলড’ হিসেবে, অথচ বাস্তবে তারা প্রতিদিন একটু একটু করে আর্থিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

এটি একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। মধ্যবিত্তের এই ভাঙন কোনো একক ব্যক্তির অদক্ষতার ফল নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি— যেখানে আয় বাড়লেও সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ে না, কর দেওয়া সত্ত্বেও সেবা পাওয়া যায় না এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব প্রকট।

মধ্যবিত্তকে প্রায়ই বলা হয় দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। অথচ সেই চালিকাশক্তির নিজের জীবনটাই চলছে অনিশ্চিত ভারসাম্যের ওপর, যেন হালকা বাতাসেই তা ভেঙে পড়বে।

মধ্যবিত্ত আজ বেঁচে আছে, কর্মরত আছে, দায়িত্ব পালন করছে—কিন্তু নিরাপদ নয়। মুহূর্তের দুশ্চিন্তা আর বিকল্প খোঁজার চেষ্টা তাদেরকে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে দিচ্ছে। তাদের আয় আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই; স্বপ্ন আছে, কিন্তু স্বপ্ন রক্ষার নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তায় হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভেতরে থাকা হাজারো প্রতিভা ও শক্তি।

এই ভাঙা অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় নীরব ক্ষতিগ্রস্ত হলো মধ্যবিত্ত— যাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায় না, কিন্তু যাদের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে থাকে পুরো সমাজ।

ফারজানা জিতু : হস্তশিল্প উদ্যোক্তা; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ; বিশেষ প্রতিনিধি, রোজকার খবর

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত