থার্টিফার্স্ট নাইট : উৎসবের নামে কি আমরা প্রকৃতিকে হত্যা করছি?

Post Thumbnail

হিমশীতল কুয়াশায় মোড়ানো বাংলাদেশের আকাশ যখন শান্ত থাকার কথা, ঠিক তখনই থার্টিফার্স্ট নাইটের অজুহাতে তা জ্বলে ওঠে ফানুস আর আতশবাজির তীব্র রোশনাইয়ে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের শোরগোল, মানুষের মুখে ফুটে ওঠে সাময়িক হাসি। কিন্তু এই চাকচিক্যময় উল্লাসের আড়ালেই ঘটে চলে এক নির্মম সত্য— প্রকৃতি, প্রাণীজগৎ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এক নীরব অথচ ভয়াবহ আঘাত।

শব্দদূষণের তাণ্ডব
পটকা ও আতশবাজির শব্দমাত্রা সাধারণত ১২০ থেকে ১৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছায়, যা সরকারি নির্ধারিত নিরাপদ সীমার অনেক গুণ বেশি। যেখানে রাতে অনুমোদিত শব্দমাত্রা মাত্র ৪০ ডেসিবেল এবং দিনে ৫০ ডেসিবেল।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের থার্টিফার্স্ট নাইটে রাত ১১টা থেকে ১২টার তুলনায় পরবর্তী এক ঘণ্টায় শব্দদূষণ বেড়েছে ১০২ শতাংশ। ২০২৪ সালেও এই বৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের কানের ওপর। স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাস, শিশু ও বয়স্কদের আতঙ্ক, অটিজম আক্রান্তদের মানসিক বিপর্যয়— সবই এই শব্দতাণ্ডবের ফল। ঘরের ভেতর থাকা পোষা প্রাণীরাও চরম ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

প্রাণীজগতের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র
পাখি ও পশুদের শ্রবণশক্তি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। হঠাৎ উচ্চ শব্দে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। রাতের বেলা যেখানে পাখিরা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে, সেখানে আতশবাজির শব্দে তারা ভয়ে এলোমেলোভাবে উড়তে গিয়ে বিদ্যুৎ লাইনে ধাক্কা খায়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় বা হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়।

রাস্তায় থাকা কুকুরদের অবস্থাও ভয়াবহ। আতঙ্কে তারা ছুটে বেড়ায়, দুর্ঘটনায় পড়ে বা গুরুতর মানসিক আঘাত পায়। এই শব্দদূষণ প্রাণীদের জন্য এক নীরব যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

কারো আনন্দ, কারো যন্ত্রণা
এই শব্দতাণ্ডব শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, গভীর মানসিক আঘাতও সৃষ্টি করে। শিশুদের ঘুম নষ্ট হয়, অসুস্থ ও বয়স্করা আতঙ্কে ভোগেন, অনিদ্রা ও উদ্বেগ বাড়ে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শব্দ PTSD-এর মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে। তখন প্রশ্ন ওঠে— এই উদযাপন কি সত্যিই সবার জন্য আনন্দের?

কুষ্টিয়া ও অন্যান্য এলাকায় পরিচালিত জনসচেতনতা অভিযানে দেখা গেছে, শব্দদূষণ পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী পশুর গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটে।

বায়ুদূষণের বিষাক্ত ছায়া
আতশবাজি থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও ভারী ধাতু বাতাসকে কয়েকদিনের জন্য বিষাক্ত করে তোলে। এর ফলে মানুষের পাশাপাশি পশুপাখির জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।

থার্টিফার্স্ট নাইটে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বায়ুমান সূচক (AQI) প্রায়ই ২০১ থেকে ৩০০-এর বেশি পর্যায়ে পৌঁছে, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। এতে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অগ্নিঝুঁকি
ফানুস বিদ্যুৎ লাইনে জড়িয়ে শর্ট সার্কিট, অগ্নিকাণ্ড ও ট্রান্সফরমার ক্ষতির ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। অতিরিক্ত লোড, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বুখলস রিলে ট্রিপের কারণে পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এতে কোটি টাকার ক্ষতি হয় এবং বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।

মানবিক বিকল্প ও সমাধান
আনন্দের অর্থ শব্দ বা ধোঁয়া নয়। নীরব আলোকসজ্জা, লেজার শো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকসংগীতের আসর কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েও নতুন বছর উদযাপন করা যায়। ভারতের দিল্লি ও ইউরোপের অনেক শহরে ‘গ্রিন নিউ ইয়ার’ উদযাপনের মাধ্যমে সফলভাবে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও পরিবেশ অধিদপ্তর বিস্ফোরকহীন, পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফানুস’ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন ও ব্যাপক জনসচেতনতা।

সময় এসেছে চেতনা জাগানোর। সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা এবং আমাদের ব্যক্তিগত সচেতন সিদ্ধান্তই পারে এই ধ্বংস থামাতে। থার্টিফার্স্ট নাইট হোক আনন্দের, ধ্বংসের নয়। প্রকৃতি রক্ষা করি, প্রাণ বাঁচাই— এটাই হোক সত্যিকারের উৎসব।