মত-অমত, সম্পাদকীয়

মত-অমত, সম্পাদকীয়

কনটেন্ট ক্রিয়েটর বনাম চিন্তাশীল লেখক

পেশার পার্থক্য নয়, সময়ের দায়

আজ আমরা এমন এক যুগে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে লেখা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, কিন্তু ‘ভাবনা’ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। এই বৈপরীত্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভিন্ন সত্তা : কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং চিন্তাশীল লেখক। এদের দ্বন্দ্বটি আসলে পেশার নয়, বরং জনপ্রিয়তার সাথে দায়বদ্ধতার লড়াই।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর : বাজারের কারিগর
একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাজারের নাড়ি নক্ষত্র বোঝেন। তিনি জানেন, ঠিক কখন কী বললে মানুষ থামবে, দেখবে এবং রিঅ্যাক্ট করবে। তিনি মূলত কাজ করেন অ্যালগরিদমের ফ্রেমে। তার কাছে লেখা বা ভিডিও একটি ‘পণ্য’, যার মেয়াদ খুবই স্বল্প। আজ যা ট্রেন্ডিং, কাল তা মূল্যহীন। সমস্যাটা ঠিক তখনই শুরু হয়, যখন বাজারই হয়ে ওঠে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড। ক্লিক, লাইক আর শেয়ারের ইঁদুর দৌড়ে হারিয়ে যায় সত্যতা। ফলে সমাজ হয়ে ওঠে দ্রুত উত্তেজিত, কিন্তু সহজেই বিভ্রান্ত।

চিন্তাশীল লেখক : অস্বস্তি তৈরির কারিগর
অন্যদিকে, একজন চিন্তাশীল লেখক জনপ্রিয়তা চান না, তিনি চান সততা। তিনি এমন কথা লেখেন, যা হয়তো সবাই শুনতে চায় না— কিন্তু শোনাটা জরুরি। তিনি ক্ষমতার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন তোলেন, পাঠককে দাঁড় করান নিজের বিবেকের আয়নার সামনে। তিনি জানেন, সত্য সবসময় নিরাপদ নয়। এই লেখকরা সহজে ভাইরাল হন না ঠিকই, কিন্তু তাদের শব্দ মানুষের ভেতরে কাজ করে— নিঃশব্দে, গভীরে। তারা এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যান, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

আজকের বাস্তবতা 
আজ কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে প্রচুর, কিন্তু ‘মানুষ’ তৈরি হচ্ছে না। চিন্তাহীন কনটেন্ট সমাজকে বানাচ্ছে প্রশ্নহীন ভোক্তা। এটি শুধু সাহিত্য বা মিডিয়ার সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক স্বাস্থ্য সংকট।

তাহলে দায় কার, দায়িত্ব কী?
কনটেন্ট ক্রিয়েটরের দায় : নিজের প্রভাব বা ইনফ্লুয়েন্সকে দায়িত্বহীনভাবে ব্যবহার করা উচিত না। অ্যালগরিদমের দাসত্ব কাটিয়ে কনটেন্টে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে হবে।

চিন্তাশীল লেখকের দায় : চুপ থেকে চলমান ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ লেখক নীরব থাকলে সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় শব্দে ঠাসা কিন্তু ভাবনায় শূন্য সস্তা কনটেন্ট।

পার্থক্যটা কোথায়?
কনটেন্ট ক্রিয়েটর মানুষের অলস সময় ভরাট করেন, আর চিন্তাশীল লেখক সেই সময়কে অর্থবহ করে তোলেন। একজন ট্রেন্ড ধরেন, আরেকজন ইতিহাসের দায় পালন করেন। সমাজ ও সভ্যতা বেঁচে থাকে দ্বিতীয়জনের হাত ধরেই।

শেষ কথা
এই সময়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের অভাব নেই, কিন্তু অভাব আছে চিন্তাশীল লেখকের— যিনি ভয় পান না, বিক্রি হন না। তাই আপনি যখন লিখবেন, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন : ‘আমি কি শুধু স্ক্রিনে জায়গা চাইছি, নাকি সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি?’
সমাজকে বাঁচাতে হলে চিন্তাশীল লেখকের জায়গা বাড়াতে হবে। আজই শুরু হোক সেই চর্চা— একটি সত্য ও সাহসী প্রশ্ন দিয়ে। সত্যই হোক সবচেয়ে বড় ভাইরাল।

লেখক : কলাম লেখক; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ 

বিষয়:
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত