
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই আইপিএল ২০২৬ আসরের জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সের দল থেকে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশনার পর কেকেআর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে ইএসপিএন ক্রিকইনফো।
ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিসিসিআই কেকেআরকে নির্দেশনা দেয়। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমেও শনিবার থেকেই আলোচনা শুরু হয়।
এর আগে বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিত সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কয়েকজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী নিহত হওয়ার ঘটনা সামনে আসায় সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে বোর্ড এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, কেকেআর চাইলে মুস্তাফিজুরের পরিবর্তে অন্য কোনো খেলোয়াড় দলে নিতে পারবে এবং সে ক্ষেত্রে বিসিসিআই অনুমতি দেবে।
গত বছর আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত আইপিএলের মিনি নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। নিলামে তাকে ঘিরে কেকেআর ও চেন্নাই সুপার কিংসের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয় এবং শেষ পর্যন্ত কেকেআরই তাকে দলে ভেড়ায়। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সাইনিং নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিটি।
তবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে মুস্তাফিজুরকে দলে নেওয়াকে কেন্দ্র করে কেকেআর এবং সহ-মালিক শাহরুখ খানকে লক্ষ্য করে সমালোচনা শুরু হয়। বিজেপি ও শিব সেনার একাধিক নেতা ভারতের জাতীয় অনুভূতির বিষয়টি উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলে শাহরুখ খান ও কেকেআরকে আক্রমণ করেন।
গেল মাসের শেষ দিকে ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জেইনে কয়েকজন ধর্মীয় নেতা হুঁশিয়ারি দেন, মুস্তাফিজুর রহমানকে যদি আইপিএল ২০২৬-এ খেলতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা ম্যাচ বানচাল করার চেষ্টা করবেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ থেকে ক্ষোভের কারণেই তারা এমন অবস্থান নিয়েছেন। প্রয়োজনে স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়া কিংবা পিচ নষ্ট করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তারা।
এর আগে নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ বানচালের ঘটনায় শিব সেনার ভূমিকার কথাও নতুন করে আলোচনায় আসে। রিনমুক্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মহাবীর নাথ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে কর্তৃপক্ষ নীরব থাকায় তাদের অনুসারীরা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারেন। সংবাদ সংস্থা আইএএনএস জানায়, ভারতের আরও কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী ঠারুর ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মুস্তাফিজুর রহমান একজন ক্রীড়াবিদ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলীর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তার বিরুদ্ধে কখনোই ঘৃণাত্মক বক্তব্য বা সহিংসতার অভিযোগ ওঠেনি। খেলাধুলা ও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উত্তেজনাকে এক করে দেখা ন্যায্য নয় বলেও মন্তব্য করেন ঠারুর।
সবশেষে বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা মেনে মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। এ বিষয়ে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মুস্তাফিজুর রহমান বা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি–টোয়েন্টি ম্যাচের এই সিরিজের জন্য ভারতীয় দল ২৮ আগস্ট ঢাকায় পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে বিসিবি। উল্লেখ্য, সিরিজটি মূলত গত বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তৎকালীন অস্থির পরিস্থিতির কারণে তা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কেকেআর তাকে দলে নেওয়ার পর পুরো আইপিএল খেলতে বিসিবির ছাড়পত্র পেয়েছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। আইপিএল ২০২৫ আসরে তিনি বদলি খেলোয়াড় হিসেবে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে তিন ম্যাচে চার উইকেট নেন। সব মিলিয়ে আইপিএলে এখন পর্যন্ত ৬০ ম্যাচ খেলে তার ঝুলিতে রয়েছে ৬৫ উইকেট। এর আগে তিনি সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের হয়েও খেলেছেন।