মত-অমত, সম্পাদকীয়

মত-অমত, সম্পাদকীয়

আন্দোলন, জনদুর্ভোগ এবং অবরুদ্ধ ঢাকা : উত্তরণের পথ কী?

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এখন যেন আন্দোলনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাবি আদায়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সহজ উপায় হিসেবে ‘রাস্তা অবরোধ’কে বেছে নেওয়া এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব শুধু প্রশাসনকে চাপে ফেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে একটি প্রধান সড়ক বন্ধ হওয়া মানেই পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। বিআরটিএ (BRTA)-র তথ্যমতে, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ যানবাহন চলাচল করে। এমনিতেই শহরটি যানজটের চাপে থাকে, তার ওপর অবরোধ বা রাস্তা বন্ধ হলে তা রীতিমতো বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

জরুরি সেবায় মানবিক বিপর্যয়
অবরোধের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখা যায় জরুরি সেবার ক্ষেত্রে। একটি আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্স মানে শুধু যানজট নয়— এটি একটি জীবনের সঙ্গে সময়ের লড়াই, যা হারলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের সময় শাহবাগ ও বিমানবন্দর সড়কে অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকায় অন্তত ১২ জন মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে থাকায় আগুন নেভাতে দেরি হওয়া বা পানি-বিদ্যুৎ মেরামতের গাড়ি সময়মতো পৌঁছাতে না পারার মতো ঘটনাও আমরা দেখেছি।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধস
অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির অংকটি বিশাল। ঢাকা চেম্বার অফ কমার্সের অনুমান অনুযায়ী, বড় কোনো অবরোধে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত হয়। প্রতিদিন ৫০ লাখের বেশি শ্রমজীবী মানুষ কর্মস্থলে যেতে বিড়ম্বনায় পড়েন। এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, পড়ে ব্যক্তিজীবনেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকায় মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ ও পারিবারিক অশান্তি তৈরি হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দিনের বেচাকেনা হারান, আর শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা মিস হওয়ার ক্ষতি তো অপূরণীয়।

আন্দোলনের নৈতিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা
দাবি যতই ন্যায়সঙ্গত হোক, পদ্ধতি যদি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তবে সেই আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কমতে থাকে। জার্মানির মতো উন্নত দেশে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় ‘ইমার্জেন্সি লেন’ খোলা রাখে, যাতে অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি গাড়ি চলতে পারে। এতে তাদের দাবির যৌক্তিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে দিনের পর দিন রাস্তা আটকে রাখলে জনগণ দাবির সঙ্গে একমত হলেও পদ্ধতির কারণে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, যা দিনশেষে আন্দোলনকেই দুর্বল করে দেয়।

সমাধানের পথ
দায়িত্বশীল আন্দোলন ও সমাধান অসম্ভব নয়, প্রয়োজন কেবল নাগরিক সচেতনতা।

  • নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ : রাস্তা বন্ধ না করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নির্দিষ্ট খোলা জায়গায় সমাবেশ করা।
  • সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কর্মসূচি : যে মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের কাছে দাবি, সুশৃঙ্খলভাবে সেই ভবনের সামনে মানববন্ধন করা।
  • ইমার্জেন্সি লেন : আন্দোলনের সময় অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার জন্য রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা।
  • মার্জিত স্লোগান : রুচিসম্মত ও ভদ্র স্লোগান ব্যবহার করা।

বিষয়টি এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়, ঢাকার বাইরেও জেলা শহরগুলোতে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে আন্দোলন আমরা অবশ্যই করব, কিন্তু মনে রাখতে হবে— অন্যের বেঁচে থাকার অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো নৈতিক কাজ নয়। আন্দোলন করা মানেই রাস্তা অবরোধ করে জনজীবন বিপন্ন করা নয়। দাবি থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে; কিন্তু তা জীবন থামিয়ে দিয়ে নয়।

লেখক : হস্তশিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত