
চোখে কালো কাজলের কদর কেবল কবিরাই দিয়েছেন— এমন নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে, এশিয়া থেকে ইউরোপে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে কাজল। কাজলের এই ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কোও।
গত ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো আরব বিশ্বের কাজলের তাৎপর্যকে স্বীকৃতি দিয়ে এটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করে।
‘আমি যখন আমার ব্রুকলিনের (আমেরিকা) ফ্ল্যাটে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে বসে আইলাইনার পরি, তখন মনে হয় আমি আমার মা, আমার দাদি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য নারীর সঙ্গে এক ধরনের সংযোগ তৈরি করছি,’ বিবিসি গ্লোবাল উইমেনকে বলেন সাংবাদিক জাহরা হানকির।
ঐতিহ্যগতভাবে নারী-পুরুষ উভয়েই চোখে কাজল বা সুরমা ব্যবহার করে আসছে। এর ইতিহাস হাজার হাজার বছর পুরোনো, সভ্যতার প্রাচীন যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
আরব বিশ্বে একে বলা হয় ‘কুহল’, তবে অন্য অঞ্চলে এর নাম ভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় কাজল বা ক্ষেত্রবিশেষে সুরমা, ইরানে সোরমে, নাইজেরিয়ায় তিরো, আর ইংরেজিতে কোল বা আইলাইনার নামে এটি পরিচিত।
ঐতিহ্যগতভাবে কাজল সাধারণত অ্যান্টিমনি, সীসা বা অন্যান্য খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি হতো। আধুনিক কাজলজাতীয় পণ্যে এখন আরও নানা ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়।
ব্রিটিশ-লেবানিজ লেখক হানকিরের কাছে এই প্রসাধন সামগ্রীটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তার পরিবার ১৯৭৫ সালের গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে লেবানন ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছিল।
‘আমরা যখন বিদেশে থাকতাম, তখন আমি মাকে মেকআপ করতে দেখতাম। আমার মনে হতো, তিনি যেন খুব গভীর কোনো কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছেন,’ বলেন তিনি।
চোখে আইলাইনার দেওয়ার সময় এখনো তিনি সেই একই সংযোগের অনুভূতি পান বলে জানান।
‘আইলাইনার : আ কালচারাল হিস্ট্রি’ বইয়ের লেখক হানকির বলেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি কাজলকে “কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড বা পণ্য হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে তুলে ধরেছে, যা সংরক্ষণ করার উপযোগী।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘এই ধরনের স্বীকৃতি কাজল তৈরির ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত জ্ঞান, রীতিনীতি ও কারুশিল্পকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এতে করে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক রূপচর্চার সংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যাওয়ার বদলে ঐতিহ্য নথিভুক্ত হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিশেষ মূল্য বহন করে।’
এক সন্ধ্যায় ইরানি এক বন্ধুর সঙ্গে রাতের খাবারের সময় হানকির যখন কাজলের একটি পাত্র বের করেন, তখন এর ইতিহাস ও প্রতীকি অর্থ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সেই কথোপকথনই তাকে কাজল এবং সামগ্রিকভাবে আইলাইনারের ইতিহাস নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে অনুপ্রাণিত করে।
‘সেই সময় আমি বুঝতে পারি, কাজল নারী, সংখ্যালঘু নারী এবং প্রবাসে বসবাসকারী নারীদের কাছে কতটা গভীর অর্থ বহন করে,’ তিনি বলেন।
সৌন্দর্যের ধারণা ছাড়িয়ে কাজল
প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও পারস্য সভ্যতায় কাজলের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়। হানকিরের মতে, প্রাচীন মিশরে লিঙ্গ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই কাজল ব্যবহার করত।
‘শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, আরও অনেক উদ্দেশ্যে তারা এটি ব্যবহার করত,’ ব্যাখ্যা করেন তিনি। কাজলের মাধ্যমে তারা আধ্যাত্মিক অনুভূতি প্রকাশ করত এবং এটি চোখকে রোগ থেকে রক্ষা করত বলেও বিশ্বাস করা হতো।
‘প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের কবরে কাজলের পাত্র দিত, যাতে পরকালে সেটি নিয়ে যেতে পারে। এতেই বোঝা যায় এটি তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
আইলাইনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভবত মিশরীয় রানী নেফারতিতিই ছিলেন মূল ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বা প্রভাবশালী ব্যক্তি, বলেন হানকির।
১৯১২ সালে নেফারতিতির বিখ্যাত আবক্ষ মূর্তি যখন জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক লুডভিগ বোরচার্ডের নেতৃত্বে একটি দল আবিষ্কার করে, তখন তাতে স্পষ্টভাবে কাজলের ব্যবহার দেখা যায়।
হানকির তার বইয়ে লেখেন, ‘তার ভ্রু সুন্দরভাবে খিলান করে বাঁকানো, নিখুঁত আকৃতির এবং ধোঁয়াটে কালো রঙে ভরাট করা— সম্ভবত কাজল দিয়েই। রঙের তারতম্যের ধরন স্পষ্ট, কিন্তু রানীর সামগ্রিক সৌন্দর্য একদম সাবলীল।’
হানকির বলেন, জার্মানির নারীরা নেফারতিতির এই ‘এক্সোটিক’ বা ভিন্নধারার চেহারা অনুকরণ করতে কাজল ব্যবহার করতে শুরু করেন এবং এটিকে সৌন্দর্য, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেন।
নেফারতিতির মেকআপ আজও জনপ্রিয় ও কালজয়ী।
‘ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত টিউটোরিয়াল রয়েছে, যেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রানীর মুখভঙ্গি অনুকরণ করা হয়,’ হানকির তার বইয়ে লেখেন।
কাজল থেকে আইলাইনার
আইলাইনার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হানকির পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরেছেন— কেরালা থেকে সুদান, মেক্সিকো, জর্ডান ও জাপান পর্যন্ত। তার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইলাইনারের ব্যবহার ও অর্থ ভিন্ন হলেও সুরক্ষার একটি রূপ হিসেবে এর ভূমিকা প্রায় সর্বত্রই একই ধরনের।
সূর্যের তাপ ও ‘নজর লাগা’ থেকে রক্ষা, ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে ঔষধি উদ্দেশ্য পর্যন্ত এর ব্যবহার রয়েছে।
শিশুদের চোখেও প্রায়ই কাজল লাগানো হয়। অনেকেই মনে করেন, এটি সুরক্ষা দেয়।
যেমন ধরুন, বাংলাদেশে একসময় একেবারে ছোট শিশুদের কপালে কাজল দিয়ে টিপ দেওয়া বা চোখ সাজানোর প্রচলন ছিল, যা এখনো অনেকের মধ্যে দেখা যায়।
জাপানে হানকির ঐতিহ্যবাহী বিনোদনশিল্পী গেইশা নারীদের সঙ্গে কথা বলেন, যারা সংগীত, নৃত্য ও কথোপকথনে দক্ষ। তারা লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন, যা সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে আজও টিকে আছে।
অন্যদিকে, মেক্সিকান-আমেরিকান চোলা সংস্কৃতিতে আইলাইনার পরিচয়, প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক গর্বের শক্তিশালী প্রতীক বলে জানান হানকির।
আর প্রাচীন মিশরের মতোই, বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আইলাইনার শুধু নারীরাই ব্যবহার করেন না।
চাদে হানকির সময় কাটান ওয়াদাবি নামের এক যাযাবর ফুলানি গোষ্ঠীর সঙ্গে, যারা তাদের বার্ষিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার জন্য পরিচিত— যেখানে নারীরা পুরুষদের সৌন্দর্য বিচার করেন।
তিনি হেসে বলেন, “জর্ডানের পেত্রায় বেদুইন পুরুষরা শুধু সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা বা ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের জন্যই নয়, বরং তারা জানেন এতে তাদের দেখতে সুন্দর লাগে বলেও আইলাইনার পরেন।
‘এটি পুরুষত্বে প্রবেশের একটি রীতি এবং সিঙ্গেল বা অবিবাহিত থাকারও একটি চিহ্ন।’
আরবি ভাষাভাষী দেশগুলোতে ‘কাজল’ বা ‘কাহিলাইন’ নামেও এটি প্রচলিত, যা কাজলের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
হানকির বলেন, কাজলকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ‘অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।’
এটি ‘বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের, বিশেষ করে আরব বিশ্বের সেইসব জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেয়, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে— বাস্তুচ্যুতি, ঔপনিবেশিকতা ও সাংস্কৃতিক বিলোপের চাপের মাঝেও।’
তবে লেখকের কাছে কাজল লাগানোর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি তার নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগের কারণে— যা কাজলের ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যায়।
তার মতে, ‘এটা প্রায় এক ধরনের আধ্যাত্মিক চর্চা। কাজল লাগানোটা যেন এক ধরনের আচার-অনুষ্ঠান। আপনি তখন শুধু চোখের নিচে বা ওপরের পাতায় একটি দাগ টানছেন না, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছেন।’