সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সংস্কৃতির এ কেমন সংস্কার চলছে?

সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তার সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধিত) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর মাধ্যমে একাডেমির বিভাগ সংখ্যা ৬টি থেকে ৯টিতে উন্নীত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি উৎসবমুখর সংবাদ। চলচ্চিত্রকে পৃথক বিভাগ করা, দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে আলোকচিত্র বিভাগ চালু করা এবং ‘নিউ মিডিয়া ও কালচারাল ব্র্যান্ডিং’-এর মতো যুগোপযোগী বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। কিন্তু প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতোই এই ‘সংস্কার’-এর চাকচিক্যের আড়ালে এমন কিছু ‘বিয়োজন’ ঘটেছে, যা দেশের সচেতন সংস্কৃতিমনা মানুষের মনে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় ও বেদনার জায়গাটি হলো— বাংলাদেশের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ‘আবৃত্তি’কে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে না রাখা। অর্গানোগ্রামে সংগীত, চারুকলা বা নাট্যকলার মতো বিভাগগুলো বহাল থাকলেও আবৃত্তির কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রাখা হয়নি। বরং যে আবৃত্তি বিভাগ ছিল তাকে বাতিল বা বিলুপ্ত করা হয়েছে এর মাধ্যমে। একে সম্ভবত ‘অন্যান্য পারফর্মিং আর্টস’-এর জগাখিচুড়িতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই দশা আমাদের হাজার বছরের লোকজ নাট্যশৈলী ‘যাত্রা’র। অথচ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান প্রতিটি সংগ্রামে কবিতার পংক্তি, সংগীত আর স্লোগানই ছিল রাজপথের বারুদ।

আরো বিস্ময়কর হলো, বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন আশির দশকের অন্যতম প্রধান কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। একজন কবির দায়িত্বকালে খোদ কবিতার বাচিক শিল্প ‘আবৃত্তি’ এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়নের শিকার হবে, এমনটা কি কেউ কখনো ভেবেছিল? এটি কি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ বা আপসকামিতা রয়েছে, তা তলিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করি।

শিল্পকলা একাডেমির এই সিদ্ধান্তকে কোনো বিচ্ছিন্ন দাফতরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুগভীর ‘সাংস্কৃতিক প্রতিস্থাপন’ (Cultural Replacement)-এর অংশ হিসেবে পাঠ করা জরুরি বলে মনে করি। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট জ্যামিতিক নকশা চোখে পড়ে, যা আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়কে উপড়ে ফেলার ইঙ্গিত দেয়।

সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড ভাঙার সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী আঘাতটি এসেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একেবারে মূলে। আমরা স্তম্ভিত হয়ে দেখেছি, গত বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের (সংগীত ও শরীরচর্চা) পদটি কীভাবে স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেওয়া হলো। অথচ শিশুদের মানসিক ও মননশীল বিকাশে ৫,১৬৬ জন সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মনগড়া ফতোয়া, উগ্র আস্ফালন এবং চাপের মুখে রাষ্ট্র যেভাবে নতি স্বীকার করল, তা নজিরবিহীন।

এই ঘটনাকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা পদ বিলুপ্তি ভাবলে ভুল হবে। এটি মূলত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উগ্রবাদের কাছে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ’। এর মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের সৃজনশীলতার বিকাশকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা হলো। প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো একটি শিশুর সংস্কৃতি চর্চার প্রথম আঁতুড়ঘর। সেখানে যখন সংগীত, চারুকলা বা শরীরচর্চার মতো বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় না, তখন শিশুরা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার ভারবাহী ‘যন্ত্রমানুষ’ হিসেবে বেড়ে ওঠে। ৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করার অর্থ হলো— সারা দেশের ৫ হাজার বিদ্যালয়ে সংস্কৃতির চর্চা ও মুক্তচিন্তার পথটি সংকুচিত করে দেওয়া। স্কুল পর্যায় থেকে সংস্কৃতি চর্চার এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটি নষ্ট করে দেওয়ার ফলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা— যার খেসারত জাতিকে দিতে হবে বহু যুগ ধরে।

এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য সাংস্কৃতিক আয়োজনের ঘোষণায়। গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬, রোববার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে একটি জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে (স্মারক সূত্রে প্রাপ্ত)। সহকারী পরিচালক মাহফুজা খাতুন স্বাক্ষরিত ঐ স্মারকে ‘চিত্রাঙ্কন, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক ও গজল প্রতিযোগিতা-২০২৬’ আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য করুন, এই তালিকায় কী কী আছে, তার চেয়েও ভয়ের বিষয় হলো— কী কী নেই।

বিস্ময়করভাবে এই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমার্থক ‘দেশাত্মবোধক গান’। নেই হাজার বছরের বাঙালির প্রাণের স্পন্দন ‘লোকসংগীত’ (জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া)। এমনকি শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের অন্যতম মাধ্যম ‘নৃত্য’ বা নাচকেও সম্পূর্ণভাবে নির্বাসিত করা হয়েছে। অথচ, এই বিষয়গুলোই আবহমানকাল ধরে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণ ছিল।

এর বদলে সংগীতের একমাত্র ক্যাটাগরি হিসেবে রাখা হয়েছে ‘গজল’। গজল অবশ্যই সংগীতের একটি মার্জিত ও নান্দনিক ধারা, এর চর্চায় কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো— যখন নিজস্ব মাটির সুর, দেশের গান এবং লোকজ সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলে কেবল একটি বিশেষ ঘরানাকে (যা মূলত আমাদের একান্ত দেশজ বা শেকড়জাত নয়) একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে শিশুদের সামনে তুলে ধরা হয়, তখন তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন জাগেই।

গজল থাকুক, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ বা ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ’ বাদ দিয়ে যখন কেবল গজলকে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন বুঝতে হবে— এটি নিছক কোনো একটি প্রতিযোগিতায় কিছু বিষয় নির্ধারণ করা নয়। বরং এটি কোমলমতি শিশুদের মনোজগৎকে শৈশব থেকেই ‘বাঙালি’ পরিচয় থেকে বিচ্যুত করে ভিন্ন কোনো সাংস্কৃতিক বলয়ে নিয়ে যাওয়ার এক সুগভীর ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’। শিশুদের শেখানো হচ্ছে— নাচ বা দেশের গান তাদের সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং বিজাতীয় বা ভিনদেশি অনুষঙ্গই তাদের জন্য একমাত্র ‘শুদ্ধ’ বিনোদন। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি প্রজন্মকে বড় করার এই গভীর ষড়যন্ত্র আমাদের সন্তান আত্মপরিচয় নিয়ে বড় হবার পথে এক অশনিসংকেত।

মাঠ পর্যায়ের চিত্রটি কেবল করুণই নয়, রীতিমতো আতঙ্ক জাগানিয়া। গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাজার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং বাউল নিগ্রহের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না; বরং তা ছিল এক সংগঠিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। লালন সাঁইয়ের আখড়া থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়ের শতবর্ষী দরগা— কোথাও নিস্তার মেলেনি। ‘মাজার বা আখড়া মানেই শিরক ও গাঁজার আস্তানা’— এই জিকির তুলে এবং ‘মব জাস্টিস’-এর অজুহাতে একদল উগ্রবাদী জনতা হাতুড়ি-শাবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমাদের লোকজ বিশ্বাসের ওপর।

আমরা শিউরে উঠে দেখেছি, কীভাবে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বাউল সাধককে জনসমক্ষে অপমান করা হয়েছে। বাউলদের জোর করে চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া বা তাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় একতারা-দোতারা আছড়ে ভেঙে ফেলার দৃশ্যগুলো কেবল সহিংসতাই নয়; বরং তা একটি জাতিসত্তার ওপর আঘাত। কারণ, বাউলের একতারা কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি এই ভূখণ্ডের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক প্রতীক। একজন সাধকের চুল কেটে দেওয়া মানে তার দীর্ঘদিনের সাধনার মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই বর্বরোচিত ঘটনাগুলো যখন ঘটছিল, তখন রাষ্ট্র বা প্রশাসন তখন ছিল দর্শকের ভূমিকায়। বিচারের বাণীর এই নীরবতা উগ্রবাদীদের আরো উৎসাহিত করেছে। এই হামলাগুলো ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা থেকে উৎসাহিত হয়ে বাংলার হাজার বছরের ‘সহজিয়া’ দর্শন ও মানবতবাদী সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। যে দর্শন বলে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’— সেই দর্শনকে নিশ্চিহ্ন করে একটি অসহিষ্ণু ও উগ্র মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই আঘাতগুলো করা হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক নিধনের এই চিত্রটি কেবল গ্রামীণ বাউল আখড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা আঘাত হেনেছে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিগুলোতেও। গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, শুক্রবার— বাংলাদেশের সংস্কৃতির জন্য এক কালো দিন। ঠিক যেদিন রাতে দেশের শীর্ষ দুই দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়, সেই একই রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) ধানমন্ডিতে অবস্থিত বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম বাতিঘর ‘ছায়ানট’ ভবনে বর্বরোচিত হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

হামলাকারীরা কেবল ভবনে ভাঙচুর চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা আগুন ধরিয়ে দেয় এবং বাদ্যযন্ত্র ও মূল্যবান নথি তছনছ করে। যে ছায়ানট বায়ান্ন থেকে একাত্তর হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি সত্তাকে জাগিয়ে রেখেছে, সেই প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা প্রমাণ করে— এই ক্ষোভ কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং এই ক্ষোভ ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে।

একই দিন সন্ধ্যায় (১৯ ডিসেম্বর) তোপখানা রোডে অবস্থিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় উদীচীর অমূল্য সব নথি ও বাদ্যযন্ত্র। যে সংগঠনটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে গান ও নাটক দিয়ে লড়াই করেছে, স্বাধীন দেশে তাদের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বিজাতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র’ আখ্যা দিয়ে। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের মূলে পরিকল্পিত আঘাত।

আবার এসবের বিপরীত এক চিত্র দেখা যাচ্ছে শহরের তুলনামূলক ধনিক, শিক্ষিত ও প্রগতিশীল বলে দাবিদার শ্রেণিতে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশীয় সংস্কৃতির শেকড়সন্ধানী গানের চেয়ে হঠাৎ করেই এখানে ‘কাওয়ালি’ বা ভিনদেশি ঘরানার পরিবেশনার দিকে প্রবল ঝোঁক ও পৃষ্ঠপোষকতা। কাওয়ালি সংগীতের একটি শক্তিশালী ও সম্মানজনক ধারা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিকল্পিতভাবে এর হঠাৎ উত্থানকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যখন নিজের মাটির গান বাউল-ভাটিয়ালিকে ‘শিরক’, ‘হারাম’ বা ‘অশ্লীল’ ফতোয়া দিয়ে কোণঠাসা করা হচ্ছে, ঠিক তখনই কাওয়ালিকে ‘নিরাপদ সংস্কৃতি’ হিসেবে যেন প্রমোট করা হচ্ছে! অর্থাৎ, কৌশলে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ‘বাঙালি’ থেকে সরিয়ে একটি আরোপিত ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’র মোড়কে বন্দি করার চেষ্টা চলছে বলে সন্দেহের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

শিল্পকলা একাডেমির নতুন অধ্যাদেশে আবৃত্তি বা যাত্রাকে যে ‘অন্যান্য’-এর অস্পষ্ট ও গৌণ ক্যাটাগরিতে ঠেলে দেওয়া কেবল দাফতরিক যেকোনো সিদ্ধান্ত মনে করে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং গভীর পর্যালোচনায় এটি সেই বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী ‘সাংস্কৃতিক প্রতিস্থাপন’-এরই এক সুকৌশল রাষ্ট্রীয় সিলমোহর কি না, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রশ্ন জাগে, কেন আবৃত্তি বা যাত্রার মতো মাধ্যমগুলোই বার বার নিগ্রহের শিকার হচ্ছে? দেশীয় শেকড়জাত সংগীতকে এড়িয়ে যাওয়া হয়?

এর উত্তর নিহিত আছে এই শিল্পগুলোর অন্তর্নিহিত শক্তিতে। আবৃত্তি তো কেবল কবিতার পাঠ বা নিছক একটি বিনোদন নয়; এটি এমন এক শিল্প— যা মানুষকে কথা বলতে শেখায়, নিজের ভাবকে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করতে শেখায়। আবৃত্তি মানুষের বোধের জানালায় আলো ফেলে, তার বিবেককে শানিত করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে শেখায়। যে জাতি আবৃত্তি করে, সে জাতি বোবা থাকতে পারে না। আবৃত্তি চর্চা মানুষের ভেতরে যে শুভবোধ, ন্যায়পরায়ণতা এবং দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়— তা যেকোনো স্বৈরাচারী বা ধর্মান্ধ শক্তির জন্য ভয়ের কারণ।

একই কথা প্রযোজ্য যাত্রাপালা, পথনাটক বা লোক সংগীতের ক্ষেত্রেও। আবহমান কাল ধরে এই মাধ্যমগুলো শোষকের বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কাজ করেছে। সমাজ সংস্কারে যাত্রার ভূমিকা ঐতিহাসিক। আজ সেই মাধ্যমগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়ে কোণঠাসা করার অর্থ হলো— প্রতিবাদের এই সহজাত ভাষাটিকেই স্তব্ধ করে দেওয়া। হয়তো ঠিক এই কারণেই, একটি বিশেষ মতাদর্শের কাছে আবৃত্তি, নাটক বা মুক্তচিন্তার এই মাধ্যমগুলো সব সময়ই ‘অস্বস্তিকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং কৌশলে এগুলোকে দমিয়ে রাখার আয়োজন চলছে।

আমরা সংস্কার চাই, কিন্তু আধুনিকতার নামে আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে নয়। শিল্পকলা একাডেমির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের সবিনয় প্রশ্ন— আউল বাউল আর কবির দেশ বাংলাদেশে কবিতা, গান আর বাউল দর্শন যদি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে এভাবে কোণঠাসা হতে থাকে, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠবে কোন পরিচয় নিয়ে? তারা কি শিকড়হীন এক যান্ত্রিক মানবগোষ্ঠীতে পরিণত হবে, যাদের নিজস্ব কোনো সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড নেই?

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং এ সময়ের অন্যতম প্রধান কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাছে আমার একান্ত জিজ্ঞাসা— আপনার সত্তাজুড়ে যে কবির বসবাস, সেই কবি কি এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন? কবিতার প্রাণ তো তার উচ্চারণে, তার ধ্বনিতে, তার প্রকাশে। আবৃত্তিশিল্পীরা যদি আবৃত্তি না করে, তবে আপনার লেখা পংক্তিগুলো কি কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি হয়ে থাকবে না? আপনি কি চান না, আপনার দ্রোহের কবিতাগুলো আবৃত্তিশিল্পীদের কণ্ঠে স্লোগান হয়ে রাজপথে প্রতিধ্বনিত হোক? কবির দায়িত্বকালে কবিতার কণ্ঠস্বর এভাবে রুদ্ধ হলে ইতিহাস কিন্তু সেই দায়ভার ক্ষমা করবে না।

শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি ও যাত্রা বিভাগ পুনর্বহালের জোরালো দাবি জানাচ্ছি আমি। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শিল্পীদের সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন নয়; বরং এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক লড়াই।

আমাদের বুঝতে হবে, এই যে ‘সংস্কার’-এর নামে ধাপে ধাপে মূল-বিয়োজন চলছে, এটি এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক প্রকৌশল’ বা কালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং। খুব ধীরগতিতে, অত্যন্ত কৌশলে আমাদের মনন থেকে, শিক্ষাঙ্গন থেকে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে হাজার বছরের উদার ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনাকে মুছে ফেলার আয়োজন চলছে। শিক্ষাঙ্গনে সংস্কৃতির স্বাভাবিক চর্চা রুদ্ধ করার অর্থ হলো— আগামী প্রজন্মকে তাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ‘সাংস্কৃতিক এতিম’ জাতিতে পরিণত করা।

আমাদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আজ যদি আমরা সমস্বরে এই ‘কৌশলী সংস্কার’-এর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব। মনে রাখা জরুরি— একটি জাতির পতন কেবল অর্থনীতি বা ভূখণ্ড হারানো দিয়ে হয় না; একটি জাতির প্রকৃত মৃত্যু ঘটে যখন তার সংস্কৃতি মরে যায়। এই আগ্রাসন থামানো না গেলে, অদূর ভবিষ্যতে মানচিত্র হয়তো থাকবে, কিন্তু সেই মানচিত্রে ‘আমাদের নিজস্ব’ বলে অহংকার করার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা তখন নিজ ভুবনে পরবাসী হয়ে বেঁচে থাকব।

মেহেদী হাসান শোয়েব : সাংবাদিক, লেখক, আবৃত্তিশিল্পী, সংস্কৃতি সংগঠক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত