
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং জাতীয় ভাগ্য নির্ধারণের এক জটিল সমীকরণ। প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সংবিধান সংস্কারের ‘গণভোট’ এবং প্রবাসীদের বিশাল ‘পোস্টাল ব্যালট’ কার্যক্রম। এই বহুমুখী কর্মকাণ্ডের চাপে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল পেতে এবার অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির ধারণা অনুযায়ী, ৩০০ আসনের পূর্ণাঙ্গ ফল পেতে ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত তো বটেই, এমনকি পরদিন অর্থাৎ ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে দেশবাসীকে। কেন এই বিলম্ব? এর পেছনে কাজ করছে তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণ।
১. এক ভোটারের দুই ভোট : সংসদ বনাম গণভোট
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণ। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারের প্রশ্নে এই গণভোট নেওয়া হচ্ছে।
চাপের মুখে প্রিজাইডিং অফিসাররা : প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন ভোটারকে দুটি ভিন্ন ব্যালট পেপারে ভোট দিতে হবে। একটি ব্যালটে তিনি তার পছন্দের সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন, অন্যটিতে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।
গণনার দ্বিগুণ সময় : ভোট গ্রহণ শেষে প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রতিটি ব্যালট আলাদাভাবে গণনা করতে হবে। সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনের প্রার্থীর ভোট গণনার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে গণভোটের ফলাফল প্রস্তুত করতে হবে। এই দ্বৈত গণনার কারণেই মূলত সময়ের প্রধান সংকট তৈরি হবে।
২. প্রবাসীদের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ ও প্রযুক্তিগত যাচাই
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রবাসীদের জন্য আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে রেকর্ড সংখ্যক সাড়ে সাত লাখ প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন।
জটিল যাচাইকরণ : সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার ও ওমানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা ডাকযোগে ব্যালট পাঠাচ্ছেন। রিটার্নিং অফিসারদের কাছে আসা এই খামগুলোর কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে অ্যাপের মাধ্যমে প্রকৃত ভোটার শনাক্ত করতে হবে। এই ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
সমন্বয় : নিয়ম অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ডাকযোগে আসা সব ব্যালট মূল বাক্সের ভোটের সঙ্গে যোগ করা হবে। প্রিজাইডিং অফিসাররা এসব ব্যালট গণনা করে তবেই চূড়ান্ত হিসাব মেলাবেন।
৩. পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনের রেকর্ড
এবারের নির্বাচনে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত হয়েছেন। প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের সরকারি চাকরিজীবী, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং কারাগারে থাকা ভোটাররাও এই তালিকায় রয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ফেনী-৩ আসনের মতো কিছু এলাকায় ১০ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোটার রয়েছেন। এত বিপুল পরিমাণ কাগজের ব্যালট যাচাই ও গণনা করতে পোলিং অফিসারদের হিমশিম খেতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, ‘একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট হচ্ছে। দুটি ভোট গণনাই একসঙ্গে শুরু হবে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পোস্টাল ব্যালট যুক্ত হওয়ায় ফলাফল ঘোষণায় কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।’
অন্যদিকে, ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চাই। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি এবং দ্বৈত ব্যালট হওয়ায় সময় বেশি লাগাটা স্বাভাবিক। সময় লাগলেও আমরা নির্ভুল ফলাফল প্রকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
১২ ফেব্রুয়ারির রাত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও উত্তেজনাকর এক রাত। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এনালগ ব্যালটের এই সংমিশ্রণে ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।