
‘বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। আমাদের সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন,’ ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
এরপর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে, শেষ হতে চলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকাল। কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি উপদেষ্টাদের কারো সম্পদের তথ্য।
অথচ আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটির অবসান ঘটবে বলেই প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের প্রত্যাশা জন্মেছিল যে, অধ্যাপক ইউনূসের সরকার বাংলাদেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটতে দেখা যায়নি। উল্টো একাধিক উপদেষ্টা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানান অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে।
‘এটা খুবই দুঃখজনক। যারা জবাবদিহিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের অস্বচ্ছ কর্মকাণ্ড দেশবাসী মোটেও প্রত্যাশা করেনি,’ বলছিলেন দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’-এর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
স্বচ্ছতার নজির স্থাপনে অন্তর্বর্তী সরকারের এই ব্যর্থতা আগামীর বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এরকম একটি অরাজনৈতিক সরকার, যেখানে বিশিষ্টজনেরা সরকারের ভেতরে রয়েছেন, তারা যখন জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও নিজেদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করে আগামী দিনের রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটা খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। আগামীর মন্ত্রী-আমলাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করার একটা উছিলা তৈরির সুযোগ করে দিয়ে গেলেন, যা আরও হতাশাজনক।’
আশ্বাস দেওয়ার পরও সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের নিয়ে সন্দেহ তৈরির অবকাশ রয়ে যাবে বলেও মনে করছেন অনেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অতীতের সরকারগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে এর একটাই কারণ আমরা অনুমান করতে পারি। সেটা হচ্ছে, উপদেষ্টারা সম্ভবত অনেক অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। সেই তথ্য প্রকাশ করলে মানুষ নানান আলোচনা করবে, প্রশ্ন তুলবে— এমন ভয় বা দুর্বলতা হয়তো তাদের মধ্যে কাজ করছে। তা না হলে সম্পদের তথ্য প্রকাশ করছেন না কেন?’
উল্লেখ্য যে, গত ১৭ মাসে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তিনজন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন এবং একজন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনী হলফনামায় নিজের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেছেন। বাকিদের সম্পদের তথ্য এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে।
নীতিমালায় কী আছে?
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর উপদেষ্টাদের আয় ও সম্পদ বিবরণীর বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে সরকার। ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ শীর্ষক ওই নীতিমালায় দু’টি ধারা রয়েছে।
প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরের ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, জুন মাসে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর থেকেই যেকোনো সময় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যায়। তবে বাংলাদেশে সচরাচর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হয়। তবে এ বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কয়েক দফায় সময় বাড়ানোর পর সবশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিটার্ন জমার সুযোগ রেখেছে। এক্ষেত্রে উপদেষ্টাদের স্ত্রী বা স্বামীর আলাদা আয় বা সম্পদ থাকলে সেগুলোর বিবরণীও প্রধান উপদেষ্টার কাছে একই সঙ্গে জমা দিতে বলা হয়।
তথ্যগুলো হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা নিজ বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে সেসব তথ্য প্রকাশ করবেন বলে নীতিমালার দ্বিতীয় ধারায় উল্লেখ করা হয়। নীতিমালাটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা পরবর্তী সরকারের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করে দিয়ে যাবেন বলে আশা করেছিলেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধিকারকর্মী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এই সরকারের উপদেষ্টারা নিজেরাই অতীতে লম্বা সময় ধরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলেছেন। ফলে আমরা আশা করেছিলাম যে, তারা সেটার একটা উদাহরণ সৃষ্টি করে যাবেন। সেই সুযোগ তাদের হাতে ছিল, যা এখন হাতছাড়া হতে চলেছে।’
নীতিমালা করার পরও সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে সরকারের সদিচ্ছার অভাবকেই দায়ী করছেন কেউ কেউ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সম্পদের তথ্য প্রকাশের যে ঘোষণা প্রধান উপদেষ্টা শুরুর দিকে দিয়েছিলেন, সেটা আসলে ছিল একটা মুখরোচক ঘোষণা। সোজা কথায় বললে, এক ধরনের স্ট্যান্টবাজি বা লোকদেখানো পদক্ষেপ। এ বিষয়ে তারা আন্তরিক বলে মনে হয় না।’
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে কত টাকা পাচার করা হয়েছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি দিয়েও উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ না করে উনারা শেখ হাসিনা সরকারের মতোই আচরণ করেছেন, যা আমাদেরকে খুবই পীড়িত ও হতাশ করেছে।’
অনিয়ম-দুর্নীতির যত অভিযোগ
সরকার গঠনের দুই সপ্তাহের মাথায় ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন অধ্যাপক ইউনূস। সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশে’ জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বছর না ঘুরতেই তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অনিয়ম-দুর্নীতির একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে।
এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ‘সীমাহীন দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দেন সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। ‘আমাদের (সরকারি কর্মকর্তাদের) না হয় চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু যারা আন্দোলন করে আজকে চেয়ারে বসেছেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টার আমি তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বুঝায় দিতে পারবো, আমার সচিব আছেন দুইজন, যে তারা (উপদেষ্টারা) সীমাহীন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত,’ ঢাকায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে বলেন মি. সাত্তার। তিনি আরও বলেন, ‘আগে তাদের (উপদেষ্টাদের সঙ্গে) কন্টাক্ট করা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে কোনো রকম নিয়োগ হবে না, কোনো বদলি হবে না। আমার কাছে প্রমাণ আছে, প্রমাণ ছাড়া কথা বলি না।’
মি. সাত্তার যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সামনে দর্শক সারিতে বসে থাকা সরকারের বর্তমান কর্মকর্তাদের ‘ঠিক, ঠিক’ ধ্বনি তুলে তাকে সমর্থন দিতে দেখা যায়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করা হয়। এছাড়া অভিযোগকারীর কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে সেটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সরকারকে নিজ উদ্যোগে অভিযোগ তদন্তে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
এ ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাঁদাবাজির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় ঘটা ওই চাঁদাবাজির ঘটনায় তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ারও জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে মি. ভূঁইয়া তখন দাবি করেছিলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ চাঁদাবাজির ঘটনায় তার নাম জড়ানো হয়েছে।
এর আগে মি. ভূঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়ে অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়। একইভাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আতিক মোর্শেদ, যিনি আগে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেও দেড়শ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে দেখা যায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করার কথা জানানো হলেও গত দশ মাসে সেটার কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। উপদেষ্টারা দাবি করেছেন, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে তারা জড়িত নন। ‘কিন্তু মন্ত্রী বা উপদেষ্টার অধীনে কাজ করার সময় তাঁর কোনো ব্যক্তিগত কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে সেই দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উপদেষ্টাও কোনোভাবে এড়াতে পারেন না,’ বলছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
গ্রামীণের সুযোগ-সুবিধা ঘিরে প্রশ্ন
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে তার হাতে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, সেটা নিয়ে ও নানা সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার দুই মাসের মাথায় গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। ব্যাংকটিতে সরকারের যে ২৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব ছিল, সেটিও কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।
এর বাইরে গ্রামীণের নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স প্রদান এবং গ্রামীণ টেলিকমকে যে ডিজিটাল ওয়ালেট সেবা প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আগে যেরকম মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে কোনো বিষয় উঠলে খুব দ্রুত গতিতে সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়ে যেত, এখন যদি আমরা প্রধান উপদেষ্টার বেলাতেও একই জিনিস দেখি, তাহলে পরিবর্তনের কী নমুনা এখানে হাজির হলো?’
এ অবস্থায় কোন প্রক্রিয়ায় সুবিধাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেটির পরিষ্কার ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় গ্রামীণের প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, সেটি পরিষ্কার ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এটা না করলে প্রশ্নটা থেকেই যাবে।’
তবে গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূস কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করেননি বলে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় থাকাটাই প্রভাব বিস্তার করার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলে সেটার বহু দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। প্রধান উপদেষ্টার ক্ষেত্রেও যে সেটা ঘটেনি, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? বিশেষ করে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকার পরও যেভাবে তড়িঘড়ি করে গ্রামীণকে সুযোগ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সেটা ঘিরে প্রশ্ন তো থেকেই যায়।’
‘এখনো সুযোগ আছে’
উপদেষ্টা ও তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় অন্তর্বর্তী সরকার ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এসব ঘটনায় সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা যে কমছে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা চলে।’ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সেগুলো খতিয়ে না দেখে যেভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের মতো এই সরকারেরও একটা অস্বীকারের প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করেছি। তারাও প্রশ্ন তোলা পছন্দ করে না। সমালোচনা করলে ট্যাগিং করতে চায়, যেটা হাসিনা সরকারের সময়ে দেখা যেত।’
উপদেষ্টাদের নিজেদের স্বার্থেই তাদের সম্পদের তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন শিক্ষক সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘এই সরকারে যারা উপদেষ্টা হিসেবে আছেন, তারা নিজেরাই আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছেন। সাময়িক দায়িত্ব শেষে তারা নিশ্চয়ই আবারও যার যার পেশায় ফিরে যাবেন। সেজন্য উনাদের নিজেদের স্বার্থেই সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি।’
দেরি হলেও সেই সুযোগ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এখনো সুযোগ আছে। চলে যাওয়ার সময়ও যদি উনারা এই তথ্যটা প্রকাশ করে যান যে, ক্ষমতাগ্রহণের সময় তাদের কাছে কী পরিমাণ সম্পদ ছিল এবং কতটুকু সম্পদ নিয়ে উনারা দায়িত্ব ছাড়ছেন, তাহলে আগামীর সরকারের জন্য সেটা একটা ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে পারবেন।’
উপদেষ্টারা কী বলছেন?
আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন কি না, সেটা জানার জন্য বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা সবাই দাবি করেছেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা নিজেদের আয় ও সম্পদের তথ্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘এখন কবে সেটা প্রকাশ করা হবে, সেটা আমি বলতে পারবো না। আমার দায়িত্ব ছিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তথ্য জমা দেওয়া, আমি সেটা দিয়েছি। গত বছরও দিয়েছি, এবারও দিয়েছি।’
নীতিমালায় বলা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে উপদেষ্টারা নিজেদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার পর সেসব তথ্য প্রকাশ করবেন প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু অধ্যাপক ইউনূসকে এখন পর্যন্ত সেটি করতে দেখা যায়নি। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হবে কি না, তা জানতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠার পর গত বছর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছিলেন যে, পদত্যাগ করার আগে তিনি নিজেই সম্পদের তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সেটা করেননি। তবে গত ডিসেম্বরে পদত্যাগ করার আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে, সরকারি বেতনের বাইরে তার অন্য কোনো আয় বা সম্পদ নেই।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ধারণা করা হচ্ছিল, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলম নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। তখন নির্বাচনী হলফনামা থেকে তাদের সম্পদের তথ্য পাওয়া যাবে বলে অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজনের কেউই প্রার্থী হননি। ফলে তাদের সম্পদের তথ্যও জানা যায়নি।
তবে আরেক সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনী হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মি. ইসলামের নিজের নামে কোনো বাড়ি-গাড়ি বা স্থাবর কোনো সম্পত্তি নেই। তবে তার ৩২ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ‘উপদেষ্টা পদের বিপরীতে প্রাপ্ত বেতন থেকে সেভিংস, পূর্ববর্তী সেভিংস, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পাওয়া উপহার, স্বর্ণালংকারের মূল্য, ফার্নিচার এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্যের সমষ্টি। পাশাপাশি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর আয়কর পরিশোধিত ইনকামও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত,’ গত ৭ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন নাহিদ ইসলাম। এর বাইরে মি. ইসলামের স্ত্রীর নামে ১৫ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম। তখন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি জানান, উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়ার পর সাত মাসে ১০ লাখ ৬ হাজার ৮০০ টাকা বেতন পেয়েছেন তিনি। খরচের পর তখন তাঁর ব্যাংক হিসেবে ছিল ১০ হাজার টাকার মতো। ফেসবুক পোস্টে মি. ইসলাম উল্লেখ করেন, ‘সেটি ছিল উপদেষ্টা পদে থাকাকালীন মোট আয়ের পর অবশিষ্ট নগদ অর্থ— মোট সম্পদের প্রতিফলন নয়। পরবর্তীতে সরকারিভাবে মন্ত্রীদের আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থ একই অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ায় ব্যালেন্স বৃদ্ধি পায়, যা হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।’