নির্বাচিত, সম্পাদকীয়

নির্বাচিত, সম্পাদকীয়

সাংবাদিককে কি রাষ্ট্র ভোটার বলে মনে করে না?

গণতন্ত্রের মহাযজ্ঞে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রধানতম শর্ত হলো ভোটাধিকার। একটি আধুনিক ও সচল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের দিনটি তাই হয়ে ওঠে নাগরিকের ক্ষমতায়নের উৎসব। আবালবৃদ্ধবনিতা যখন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের রায় জানান দিতে উন্মুখ, তখন এই উৎসবের নির্মোহ চিত্র যারা জাতির সামনে তুলে ধরেন, সেই গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থান কোথায়? নির্বাচনের দিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ভিড় ঠেলে, কখনো বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেন, দিনশেষে দেখা যায় সেই সাংবাদিকদেরই এক বড় অংশ নিজের ভোটটি দিতে পারেন না। গণতন্ত্রের এই পাহারাদাররা ব্যালট বাক্সের ফুটেজ সংগ্রহ করলেও বাক্সে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন না। আপাতদৃষ্টিতে একে ব্যক্তিগত বঞ্চনা মনে হলেও, এটি মূলত আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত গলদ, যা নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার অভাবকেই ঈঙ্গিত করে।

আইনের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্র কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে ভোট না দিতে পারার সংকটটি আগেই আঁচ করতে পেরেছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও (১৯৭২)-এর ২৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে ‘পোস্টাল ব্যালট’ বা ডাকযোগে ভোট প্রদানের। এই আইনের মূল দর্শন হলো— রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বা অনিবার্য কারণে যারা নির্বাচনের দিন নিজ ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে পারবেন না, রাষ্ট্র তাদের ভোটাধিকার হরণ করবে না, বরং বিকল্প উপায়ে তা নিশ্চিত করবে। বর্তমানে এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী, এমনকি কারাগারে থাকা বন্দিরাও। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন প্রবাসীরাও। অথচ নির্বাচনের মাঠে কাঁধে ক্যামেরা বা হাতে বুম নিয়ে দৌড়ানো যে সাংবাদিক, ডিনি পুলিশ বা পোলিং অফিসারের মতোই ব্যস্ত সময় পার করছেন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে, নির্বাচন কমিশনের খাতায় তার নাম নেই। তিনি যেন এই প্রক্রিয়ার কেউ নন, কেবলই এক পর্যবেক্ষক!

নির্বাচন কমিশনের দাপ্তরিক তথ্যমতে, নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রত্যক্ষ দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন ৯ লাখের বেশি কর্মকর্তা। অন্যদিকে, নির্বাচনের মাঠের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আনসার, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ড ও সশস্ত্র বাহিনী মিলিয়ে নিয়োজিত ছিলেন আরও প্রায় ৮ লাখ সদস্য। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের প্রায় ১৭ লাখ কর্মী পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। এর বাইরে যুক্ত হয়েছে বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা বলছে, বর্তমানে মোট ভোটারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসী। দেশের অর্থনীতি সচল রাখা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্যও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার দুয়ার খুলেছে কমিশন।

রাষ্ট্রের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিচায়ক। ১৭ লাখ সরকারি কর্মী এবং লাখ লাখ প্রবাসী— সব মিলিয়ে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু ট্র্যাজেডিটা ঠিক এখানেই। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় কারা নির্বাচনসংশ্লিষ্ট খবরগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন? কারা মানুষকে যানাচ্ছেন— ‘এবার রেকর্ড সংখ্যক পোস্টাল ভোট’, বা ‘প্রবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ’? পোস্টাল ভোট, গণভোট বা সংসদ নির্বাচনের খবরগুলো যারা তৈরি করছেন, সেই সাংবাদিকরাই রাষ্ট্রের আইনে সবচেয়ে বড় উপেক্ষিত রয়ে গেছে! একজন সাংবাদিক যখন রিপোর্ট করছেন যে, সুন্দরবনের গহীনে কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যটি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন, তখন সেই সাংবাদিক নিজে ভোট দিতে পারছেন না। প্রবাসীরা হাজার মাইল দূর থেকে ভোট দিতে পারছেন, অথচ একজন সাংবাদিক কেবল এক জেলা থেকে অন্য জেলায় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে ভোট দিতে পারছেন না। রাষ্ট্র কি তবে বোঝাতে চাইছে— সাংবাদিকদের কাজ কেবল অন্যের ভোটের গল্প বলা, নিজের ভোট দেওয়া নয়? সাংবাদিকের ভোট বা ভোটাধিকার মূল্যহীন?

নির্বাচনের সময় সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ছোটাছুটি করতে হয়— এটা সমস্যার একটা খণ্ডচিত্র মাত্র। মূল সংকটটা আরও গভীরে এবং এটি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্নায়ুকেন্দ্র হলো ঢাকা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার সংবাদকর্মী জীবিকার তাগিদে এই ইট-পাথরের শহরে থিতু হয়েছেন। কিন্তু তাদের অনেকেরই ভোটার এলাকা বা শেকড় রয়ে গেছে নিজ নিজ গ্রামে বা মফস্বলে। নির্বাচনের দিন যখন সাধারণ মানুষের ছুটি, তারা নিজেদের ভোটার এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে পারছেন, তখন সংবাদকর্মীদের জন্য সেটিই বছরের সবচেয়ে কঠিন ও ব্যস্ততম দিন। সংবাদকক্ষগুলো তখন সরগরম থাকে ব্রেকিং নিউজের তাড়নায়। অফিসের রোস্টার বা ডিউটি শিডিউল একজন সাংবাদিককে বেঁধে ফেলে তার কর্মস্থলেই।

এখন ধরা যাক, একজন সাংবাদিকের ভোটার এলাকা রংপুরে, বরিশালে কিংবা ফরিদপুরে, কিন্তু তিনি কর্মরত ঢাকায়। নির্বাচনের দিন তাকে ঢাকার কোনো ভোটকেন্দ্রের খবর সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হলো, বা নিউজরুমের দায়িত্বই পড়ল। এই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে কি আদৌ সম্ভব শত মাইল পাড়ি দিয়ে নিজের গ্রামে গিয়ে ভোট দিয়ে আবার কাজে ফেরা? অসম্ভব। ছুটি তো নেই-ই, বরং কাজের চাপে নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত মেলে না ওই দিন। ফলে, সারা দিন অন্যের ভোট দেওয়া বা না-দেওয়ার খবর সংগ্রহ এবং প্রকাশ করতে করতেই নিজের মূল্যবান ভোটাধিকারটি বিসর্জন দিতে হয় তাকে। চোখের সামনে গণতন্ত্রের উৎসব চলে, মানুষ লাইন ধরে ভোট দেয়, আর সেই খবর পৌঁছে দিতে গিয়ে পেশাদারিত্বের শিকলে বন্দী সাংবাদিক নিজের ভোটটিই দিতে পারেন না। এই বঞ্চনার শিকার কোনো একজন বা দুজন নন; সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে— এই সংখ্যা হাজার হাজার।

নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হয়তো যুক্তি দেখাতে পারেন যে, সাংবাদিকরা তো সরকারি কর্মচারী নন, তাই তাদের পোস্টাল ব্যালট দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এই যুক্তি ধোপে টেকে না। কারণ, পোস্টাল ব্যালটের মূল স্পিরিট বা চেতনা সরকারি বা বেসরকারি ‘চাকরি’ নয়, বরং ‘দায়িত্বের কারণে অনুপস্থিতি’। একজন সরকারি কর্মচারী যেমন রাষ্ট্রের নির্দেশে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না, একজন সাংবাদিকও তেমনি জনস্বার্থে তথ্য জানানোর দায়বদ্ধতা থেকে কেন্দ্রে যেতে পারেন না। উভয়ের অনুপস্থিতির কারণটি যৌক্তিক এবং জনগুরুত্বপূর্ণ। সেই মানদণ্ডে সাংবাদিকরা পোস্টাল ভোটের জন্য শতভাগ বিবেচনাযোগ্য।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, যাদের নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ আমাদের চেয়েও বিশাল, তারা এই সমস্যার সমাধান করেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে। ভারতের নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের এসেনশিয়াল সার্ভিস বা জরুরি পরিষেবার আওতাভুক্ত করে পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ নিশ্চিত করেছে। সেখানে সাংবাদিকরা নির্বাচনের আগেই নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে ডাকযোগে ভোট দিতে পারেন। এতে সেখানকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি, বরং সাংবাদিকরা তাদের নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে পেরেছেন। আমাদের দেশেও কি এটি অসম্ভব? অপব্যবহার হওয়ার যে জুজু দেখানো হয়, তা পিআইডি কার্ড (প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড) এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে এই সমস্যার সমাধান খুব কঠিন বা ব্যয়সাপেক্ষ কিছু নয়। আরপিও-র ২৭ অনুচ্ছেদে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির সংজ্ঞায় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ‘অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী’ শব্দবন্ধটি যুক্ত করাটা শুধু সদিচ্ছা থাকলেই সম্ভব। আইন সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়েও কমিশন চাইলে সংবিধানের প্রদত্ত ক্ষমতায় প্রজ্ঞাপন জারি করে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করতে পারে। অন্তত জাতীয় নির্বাচন কাভার করা সাংবাদিকদের দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে এর পরিসর বাড়ানো যেতে পারে।

সাংবাদিকরা তো আর ভিনগ্রহের প্রাণী নন, তারাও এই রাষ্ট্রের করদাতা ও ভোটার। ১৭ লাখ সরকারি কর্মী আর লাখ লাখ প্রবাসী যদি পোস্টাল ভোটের সুযোগ পান, তবে গণতন্ত্রের পাহারাদার সাংবাদিকরা কেন পাবেন না? নির্বাচন কমিশন যদি সত্যিই একটি সর্বজনীন, অংশগ্রহণমূলক ও প্রশ্নহীন নির্বাচন চায়, তবে সাংবাদিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ বাহক নন, তারাও এই রাষ্ট্রের মালিকানার অংশীদার। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা বা দয়া নয়, এটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার। রাষ্ট্রের উচিত এই অধিকার নিশ্চিত করে প্রমাণ করা যে, গণতন্ত্রের প্রহরীকে রাষ্ট্র তার নাগরিক হিসেবেও মর্যাদা দেয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
    গত ৭ দিনের কোনো জনপ্রিয় খবর পাওয়া যায় নি।