সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

ভোটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় থেমেছে আনুষ্ঠানিক প্রচারের শোরগোল। এখন কেবলই ক্ষণগণনা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভোট নয়, বরং গণতান্ত্রিক এক বড় এবং কঠিন পরীক্ষা।

বিগত সরকারের আমলের টানা তিনটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের ফলে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে। যদিও দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। তাতে করে ইতোমধ্যেই এই নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবুও একটি সুষ্ঠু, ও ভোটার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেওয়া এখন কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং জনআকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন। এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প এখন নেই।

এবারের প্রচারপর্বের পরিবেশ তেমন উত্তপ্ত না হলেও অস্বস্তির কাঁটা হয়ে বিঁধছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ। টিআইবি-র তথ্যমতে, তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫ জনের প্রাণহানি এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার সেই সহিংস চিত্রকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দেওয়া ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান জনমনে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

আমরা মনে করি, নির্বাচনের দিন ও ভোট-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা রোধ করাই হবে ইসি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং বডি-ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে কারিগরি ত্রুটি বা বিদ্যুৎ-ইন্টারনেটের কারণে যদি এসব ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, তবে তা যেন নিরাপত্তার ফাঁক তৈরি না করে, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে।

এবারের নির্বাচনে এক লাখ সেনাসদস্যসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সহস্রাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনী অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েনই শেষ কথা নয়; যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ও নিরপেক্ষ কঠোর পদক্ষেপই পারে শান্তি বজায় রাখতে।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য এবং ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। ইসিকে এই ডিজিটাল ফ্রন্টে সজাগ থাকতে হবে যাতে কোনো ধরনের ভুল তথ্য দাঙ্গার সূত্রপাত করতে না পারে।

পরিশেষে, একটি সার্থক নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। জনগণের রায় যা-ই হোক, তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংযম প্রদর্শন অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই নির্বাচনকে একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।

গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় নির্বাচনের দিনে। আমরা বিশ্বাস করি, যদি সব পক্ষ সততা ও সাহসের সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে, তবে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
    গত ৭ দিনের কোনো জনপ্রিয় খবর পাওয়া যায় নি।