জাতীয়, লিড নিউজ

জাতীয়, লিড নিউজ

রোজকার এক্সপ্লেইনার

কেমন হলো তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার? চ্যালেঞ্জ কী?

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হলো দেশের নতুন সরকার। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বাংলাদেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরল বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৫০ সদস্যের এই নতুন মন্ত্রিসভায় একদিকে যেমন তারুণ্যের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ নেতাদের বাদ দেওয়া এবং বিতর্কিত ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বসানো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও দলের ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

অনন্য রেকর্ড ও শপথের ভিন্নতা
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল রেকর্ডের জন্ম হয়েছে। তার বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রপতি এবং মা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। একই পরিবার থেকে তিনজন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হওয়ার নজির আধুনিক বিশ্বে বিরল। এছাড়া ১৯৯১ সালের পর, অর্থাৎ দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশ একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেল।

শপথ অনুষ্ঠানের স্থান নির্বাচনেও এবার ভিন্নতা দেখা গেছে। প্রথাগতভাবে বঙ্গভবনের দরবার হলের পরিবর্তে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভাকে শপথ পড়ান। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন গত তিন বছরে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনকে (আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকার) শপথ পড়িয়েছেন।

একই দিনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে শপথ নেন, যা দীর্ঘ তিন দশক পর আবারও সিইসির মাধ্যমে শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক চর্চার পুনরাবৃত্তি।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক : ড. খলিলুর রহমান 
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে টেকনোক্র্যাট কোটায় ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। পেশাদার এই কূটনীতিক শপথের আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মূল কারণ ড. খলিলুর রহমানের পূর্ববর্তী ভূমিকা। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালীন তিনি মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা করিডোর বা সেফ জোন তৈরির প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করেছিলেন। তখন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এই প্রস্তাবকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। বিদেশি কোম্পানিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও তার নাম যুক্ত ছিল, যা নিয়ে বিএনপি তখন তীব্র বিরোধিতা করে এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে তার অপসারণও চেয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে ব্যক্তির নীতিকে বিএনপি মাত্র কয়েক মাস আগেও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী মনে করত, তাকেই এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর দপ্তরে বসানো হয়েছে। এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট হিসেবে তার এই নিয়োগ দলের পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নতুন মুখ ও অভিজ্ঞদের বঞ্চনা : দলীয় প্রতিক্রিয়া
৫০ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায় ৪০ জনই নতুন মুখ। অনেকেই প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই সরাসরি মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এই পরিবর্তনের ফলে বাদ পড়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও জ্যেষ্ঠ নেতারা। খালেদা জিয়ার সাবেক মন্ত্রিসভার সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ড. আব্দুল মঈন খান নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।

দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই সিদ্ধান্তে দলের তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তরুণ কর্মীরা নতুন মুখগুলোকে স্বাগত জানালেও, দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী অংশটি মনে করছে, অভিজ্ঞদের পুরোপুরি বাদ দেওয়ায় সরকার পরিচালনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, যারা গত ১৭ বছর মামলা-হামলা সহ্য করে দল ধরে রেখেছিলেন, তাদের অনেককেই অবমূল্যায়ন করা হয়েছে বলে দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

তবে, প্রধানমন্ত্রী ১০ জন উপদেষ্টার যে তালিকা দিয়েছেন, সেখানে মন্ত্রী পদমর্যাদায় মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভীকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় রেখে সেই ক্ষোভ প্রশমনের কিছুটা চেষ্টা করা হয়েছে।

শরিকদের মূল্যায়ন ও সংসদের বিরোধী পক্ষ
নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেলেও সরকার গঠনে শরিকদের যুক্ত করা হয়েছে। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং এনডিএম-এর ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চব্বিশের আন্দোলনের স্পিরিট বা চেতনা ধরে রাখতেই শরিকদের এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, যা সংসদে তরুণ নেতৃত্বের উপস্থিতিকে শক্তিশালী করবে।

আগামীর চ্যালেঞ্জ : অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার
নতুন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। আইএমএফ-এর ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর ভর্তুকি কমানোর চাপ রয়েছে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা এই সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ। গত দেড় দশকে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে যে দলীয়করণ হয়েছে, তা ভেঙে একটি পেশাদার আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা অত্যন্ত জটিল কাজ। অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের অভাব এবং নতুনদের প্রশাসনিক অদক্ষতা এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ধীরগতি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া, দলের ভেতরে পদবঞ্চিত সিনিয়র নেতাদের মান-অভিমান সামাল দিয়ে দলের ঐক্য ধরে রাখা এবং জোটের শরিকদের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করাও তারেক রহমানের জন্য রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য, যেখানে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার অতীত বিতর্ক কাটিয়ে দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
    গত ৭ দিনের কোনো জনপ্রিয় খবর পাওয়া যায় নি।