মত-অমত, শৈশব

মত-অমত, শৈশব

ট্রেন্ডের সাজ না শিকড়ের পরিচয়?

স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানেই উৎসবের আবহ। রঙিন পোশাক, ছোট ছোট পদচারণা, অভিভাবকদের ব্যস্ততা আর মঞ্চজুড়ে শিশুরা। যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতা এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো— শিশুর কল্পনাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই আয়োজনের ভেতরে এমন কিছু প্রবণতা ঢুকে পড়েছে, যা নিয়ে আজ গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। প্রশ্নটা সরল: আমরা কি শিশুদের সৃজনশীল হতে শেখাচ্ছি, নাকি কেবল ট্রেন্ড অনুসরণ করতে বাধ্য করছি?

শিশুরা পৃথিবীতে আসে এক ধরনের নির্মল শূন্যতা নিয়ে। তারা অনুকরণ করে, অনুসরণ করে এবং চারপাশ দেখে শেখে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, চার থেকে দশ বছর বয়সের মধ্যেই মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়। এই সময়টায় শিশু তার পরিবার, শিক্ষক, গল্পের চরিত্র কিংবা কার্টুন থেকে তার জীবনের প্রথম আদর্শগুলো খুঁজে নেয়। তার ভেতরে ‘আমি কে’ এবং ‘আমার অবস্থান কোথায়’— এই প্রশ্নগুলোর বীজ তখনই অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। তাই এই বয়সে আমরা তাকে কোন রূপে মঞ্চে দাঁড় করাচ্ছি, তা নিছক বিনোদনের বিষয় নয়; এটি তার ভবিষ্যৎ পরিচয় নির্মাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে সাজানো হচ্ছে বড়দের মতো করে— গ্ল্যামার, কৃত্রিম ভঙ্গি, অতিরিক্ত মেকআপ বা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো চরিত্রের হুবহু আদলে। মুহূর্তের জন্য তা আকর্ষণীয় মনে হয়। হাততালি পড়ে, ছবি ভাইরাল হয়, প্রশংসাও আসে। কিন্তু এই প্রশংসা কি স্থায়ী? আর সেই সাজ শিশুর ভেতরে কী বার্তা দিচ্ছে? সে কি নিজের স্বকীয়তা শিখছে, নাকি শিখছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য অন্যের অভিনয় করতে?

যখন একটি শিশু তার বয়সের চেয়ে বেশি গ্ল্যামারাস সাজে বা বড়দের অনুকরণে হাততালি পায়, তখন তার অবচেতন মনে একটি নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে। সে ভাবতে শুরু করতে পারে যে— আমি নিজে যা বা আমার যে শিশুসুলভ সরলতা, তা যথেষ্ট নয়; বরং কৃত্রিম কিছু হওয়াই সফলতার চাবিকাঠি। এটি তার ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাসে এক ধরনের ফাটল ধরায়। সে তখন আসল হওয়া নয়, বরং অন্যের চোখে আকর্ষণীয় হওয়াকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি বলা হয়, যা শিশুকে তার সহজাত বিকাশ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

ট্রেন্ডের স্বভাবই হলো অস্থায়ী। আজ যা জনপ্রিয়, কাল তা বিস্মৃত। কিন্তু শৈশবের অভিজ্ঞতা ক্ষণস্থায়ী নয়। এই বয়সে পাওয়া স্বীকৃতি ও উপস্থাপনার ধরন শিশুর আত্মমর্যাদাবোধে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, যখন কোনো শিশু গ্রামের ডাকপিয়ন, কৃষক, তাঁতি বা মৃৎশিল্পীর সাজে আসে, তখন সে শুধু অভিনয় করে না; সে সমাজের বাস্তব কাঠামোর একটি নিবিড় অংশকে বুঝতে শেখে।

এই লোকজ সাজগুলো শিশুকে কেবল ইতিহাস চেনায় না, বরং তাকে তার চারপাশের সাধারণ মানুষের জীবন ও শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। এটি তার মাঝে গভীর সহমর্মিতা তৈরি করে। সে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, এই সমাজ নানা পেশা ও নানা মানুষের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই বোধটি তাকে যান্ত্রিক জীবনেও একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

যেমন, একটি শিশু যখন মিনা চরিত্রে সেজে আসে, তখন তার সাজ কেবল বিনোদন নয়; এর ভেতরে শিক্ষা, অধিকার ও সচেতনতার বার্তা থাকে। এই চরিত্রটি যেমন বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তেমনি এটি সুস্থ সামাজিক মূল্যবোধ বহন করে। শিশুটি অবচেতন মনেই বুঝতে পারে যে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম এবং সমতা একটি মানবিক অধিকার। এখানে সৃজনশীলতা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা— এখানে নিজের মাটির শিকড় আছে।

সৃজনশীলতার অর্থ সীমাহীন বা লক্ষ্যহীন স্বাধীনতা নয়; বরং এটি হওয়া উচিত অর্থপূর্ণ। শিশুকে যদি বলা হয় পরিবেশ রক্ষা নিয়ে ভাবতে, লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে উপস্থাপন করতে বা স্থানীয় কোনো ইতিহাসকে ফুটিয়ে তুলতে, তবে সে তার কল্পনাশক্তি ব্যবহার করেই সৃজনশীল হবে। তখন সে অবাস্তব কোনো ভাইরাল ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে শিখবে।

এখানে মিডিয়ার প্রভাবও অস্বীকার করার উপায় নেই। ইউটিউব, শর্ট ভিডিও এবং দ্রুত বদলে যাওয়া অনলাইন চ্যালেঞ্জগুলো এখন শিশুদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। অনেক সময় অভিভাবকরাও এক ধরনের সামাজিক চাপে পড়ে যান। অন্যের সন্তান যা করছে, নিজের সন্তানও তা করুক— এই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব অজান্তেই কাজ করে। কিন্তু এই অন্ধ অনুকরণ কি শিশুকে কোথাও অকালপক্ব করে তুলছে না? বয়সের আগে বড়দের জীবনবোধ বা অভিনয় রপ্ত করা তাকে বাহ্যিকভাবে পরিণত দেখাতে পারে, কিন্তু ভেতর থেকে সে তার শৈশবকে হারিয়ে ফেলে।

শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন স্থিতি, নিরাপত্তা এবং বয়সোপযোগী অভিজ্ঞতা। শৈশবের নিজস্ব একটি গতি আছে, সেটিকে সম্মান করা আমাদের দায়িত্ব। যদি আমরা তাদের অকালপক্ব জীবনবোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই, তবে তারা শৈশবের সরল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে। ধীরে বড় হওয়াই প্রকৃতির নিয়ম, এবং সেই নিয়মেই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।

এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকের যৌথ দায়িত্ব অনেক। স্কুলগুলো চাইলে নির্দিষ্ট থিমভিত্তিক আয়োজন করতে পারে—যেমন ঐতিহ্য, পরিবেশ, লোকজ পেশা, জাতীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতি। এতে শিশুরা একটি সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, আবার তাদের সৃজনশীল স্বাধীনতাও বজায় থাকে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে যে সাজ যেন কোনোভাবেই শিশুর ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে না যায়। অতিরিক্ত কৃত্রিমতা এড়িয়ে শিশুর স্বাভাবিক হাসি ও স্বতঃস্ফূর্ততাকেই সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুর নিজস্ব মতামত শোনা। সে কেন কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র হতে চায়, সেই সাজটি নিয়ে তার মনের ভেতর কী ধারণা কাজ করছে—এই আলাপগুলোই তার চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করবে। জোর করে কোনো ধারণা যেমন চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত, তেমনি অন্ধ অনুকরণের স্রোতে শিশুকে ভাসিয়ে দেওয়াও ক্ষতিকর।

কর্ডোভা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় কে.জি. ওয়ানের শিক্ষার্থী ৫ বছর বয়সী শেখ আয়েশা বিনতে নূর আনায়া সেজেছে ‘মিনা’

শৈশব হলো কাঁচা মাটির মতো। আমরা আজ যে ছাঁচে তাদের মননকে ঢালব, সেটাই একদিন শক্ত হয়ে তাদের চরিত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের বারবার ভাবা দরকার— আমরা কি আমাদের সন্তানদের ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ডের সস্তা আলোয় সাজাচ্ছি, নাকি এমন পরিচয়ে বড় করছি যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল ও অর্থবহ হবে?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কেবল পোশাকের নয়, বরং মূল্যবোধের। আমরা কি তাদের শেখাব বাহ্যিক জনপ্রিয়তার কৃত্রিম ভাষা, নাকি নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে আত্মমর্যাদার শাশ্বত ভাষা? ট্রেন্ডের সাজ সাময়িকভাবে চোখে লাগে, কিন্তু শিকড়ের পরিচয়ই প্রকৃত মানুষ গড়ে তোলে। সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই নিতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
    গত ৭ দিনের কোনো জনপ্রিয় খবর পাওয়া যায় নি।