ফিচার, মত-অমত, শৈশব

ফিচার, মত-অমত, শৈশব

স্ক্রিনের আড়ালে শৈশব : অটিজম সচেতনতায় জরুরি বার্তা

২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এই দিনে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অটিজম সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকে সচেতন করা। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা।

আজকের শিশুদের বিনোদন থেকে শুরু করে শেখা—সবকিছুতেই স্মার্টফোনের প্রভাব স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানকে শান্ত রাখার জন্য মোবাইলকে “নীরব দুধের বোতল” হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে সাময়িকভাবে শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ছোট শিশুদের মাথার হাড় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ পাতলা হওয়ায় মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন তাদের মস্তিষ্কে তুলনামূলকভাবে বেশি, প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এটি তাদের স্নায়বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ভাষা বিকাশে বিলম্ব, চোখে চোখে যোগাযোগে অনীহা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় ঘাটতি এবং আচরণগত পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা অনেক সময় অটিজমের বৈশিষ্ট্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এছাড়াও দীর্ঘসময় স্ক্রিনে ডুবে থাকার কারণে শিশুরা বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। খেলাধুলা, সমবয়সীদের সঙ্গে যোগাযোগ, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনও কমে যাচ্ছে। এতে তাদের সামাজিক ও ভাষাগত দক্ষতা স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি— অটিজম একটি জটিল স্নায়বিক বিকাশগত অবস্থা, যার পেছনে বিভিন্ন জৈবিক ও পরিবেশগত কারণ কাজ করে। স্ক্রিন টাইম সরাসরি অটিজম সৃষ্টি করে এমন প্রমাণ সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং অটিজমের মতো কিছু লক্ষণকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে।

শিশুর সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। দুই বছরের কম বয়সী শিশুকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখা সবচেয়ে জরুরি। তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা উচিত। মোবাইল বা ট্যাবের পরিবর্তে শিশুদের বই, খেলনা, গল্প বলা এবং সরাসরি খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। শিশুর সাথে সময় কাটানো, কথা বলা এবং চোখে চোখে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাবা-মায়ের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহারে সচেতন হওয়া, কারণ শিশুরা অনুকরণ করেই শেখে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ— এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করলে তা আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিটি শিশুর সুস্থ বিকাশের অধিকার রয়েছে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে সচেতন হই, স্ক্রিন ব্যবহারে সংযম আনি এবং শিশুদের জন্য একটি সুস্থ, আন্তরিক ও মানবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করি।

লেখক : ইন্টার্ন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট, সদস্য, এসএসএলটি, সিআরপি, সাভার।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত