
বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানি বিহারিদের প্রসঙ্গটি কেবল একটি মানবিক সংকটের গল্প নয়; এটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। অর্ধশত বছর ধরে একটি প্রশ্নই আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের শুধুমাত্র প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করে, আর প্রয়োজন ফুরোলেই তাদের অস্বীকার করে?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তান ঠিক এই পথেই হেঁটেছে। ১৯৪৭ সালের পর উর্দুভাষী বিহারিরা পাকিস্তানের আদর্শিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে তারা ছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের এক প্রতীক। কিন্তু এই ‘নিজেদের মানুষ’ ধারণাটি ছিল রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি নির্মাণ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিহারিদের একটি অংশকে পাকিস্তানি সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে। অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাঙালিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় অংশ নেয়। এই সংঘাত তাদের জন্য ছিল না কেবল রাজনৈতিক, বরং অস্তিত্বের প্রশ্নে ঠেলে দেওয়া একটি ট্র্যাজেডি। যুদ্ধ শেষে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন সেই একই বিহারিরা হয়ে পড়ে ‘অচেনা’। পাকিস্তান সরকার তাদের নিতেও চায় না। এমন পরিস্থিতিতে গত ৫৫ বছর ধরে না তারা পাকিস্তানের, না পুরোপুরি বাংলাদেশের।
এখানেই পাকিস্তানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যারা একসময় পাকিস্তানের আদর্শিক অংশ ছিল, মুক্তিযুদ্ধে যাদের অনেকেই সরাসরি পাকিস্তানের সহযোগী ছিল, পাকিস্তানে তাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কখনোই পূরণ হয়নি। ‘পুনর্বাসন’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু তা সীমাবদ্ধ থেকেছে কাগজপত্রে, কূটনৈতিক আলোচনায় এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে। বাস্তবে বিহারিদের জীবন আটকে গেছে ক্যাম্পের ভেতরে— অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য এবং পরিচয় সংকটে।
এই দীর্ঘ নীরবতা আসলে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে— পাকিস্তান তাদের আর চায় না। এটি কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কারণ একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের স্বীকার করতে চায়, তখন আন্তর্জাতিক চাপ, কূটনৈতিক জটিলতা কিংবা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাকে থামাতে পারে না। এখানে অনুপস্থিত ছিল সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশও শুরুতে এই সংকটের সহজ সমাধান দিতে পারেনি। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে রাষ্ট্রটি। বিহারিদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভও ছিল প্রবল। ফলে তাদের অবস্থান দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থেকে যায়। তবে সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে।
বাংলাদেশের আদালত ধীরে ধীরে এই ইস্যুটিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের রায়ের মাধ্যমে বিহারি সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশকে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রদান করা হয়। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে— বাংলাদেশ অন্তত এই সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে দায়িত্ব গ্রহণের পথে এগিয়েছে।
তবে বাস্তবতা এখনো নিখুঁত নয়। অনেক বিহারি এখনো সামাজিকভাবে প্রান্তিক, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং পরিচয় সংকটে ভুগছে। তবুও রাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে— মানবিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইচ্ছা।
বর্তমানে যখন আবার এই ইস্যুটি সামনে আনা হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— কেন এখন? এতদিন ধরে যে মানবিক দায়বদ্ধতা অনুপস্থিত ছিল, তা কি হঠাৎ করে জেগে উঠেছে? নাকি এটি আবারও কোনো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ?
পাকিস্তানের জন্য এই ইস্যুটি হয়তো একটি কূটনৈতিক বা কৌশলগত হাতিয়ার হতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা কিংবা অতীতের দায় এড়িয়ে যাওয়ার একটি উপায় হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু বিহারিদের জন্য এটি কোনো কৌশল নয়— এটি তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা, তাদের জীবনের গল্প।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে— তারা আসলে কার? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই, কারণ এটি কেবল আইনি পরিচয়ের নয়, বরং মানসিক ও সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন।
সবশেষে, এই পুরো গল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি খুবই সরল। যারা একসময় “আপনার মানুষ” ছিল, তাদের ফেলে আসা কোনো দুর্ঘটনা নয়— এটি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ত্যাগ করে, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি নৈতিক ব্যর্থতা।
পাকিস্তান সেই ব্যর্থতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আড়াল করেছে। কিন্তু ইতিহাসের কাছে এই সত্য লুকানো সম্ভব নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার মানুষের প্রতি আচরণের মাধ্যমেই— কথার মাধ্যমে নয়, কাজের মাধ্যমে। পাকিস্তান তার নিজ নাগরিকদের সঙ্গে বেইমানি করেছে।
সিয়াম সারোয়ার জামিল : সাংবাদিক ও পিএইচডি গবেষক।