শিল্প-সাহিত্য

শিল্প-সাহিত্য

সংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তির প্রয়াণ

আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি ভারতীয় সংগীত জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর কণ্ঠের জাদুতে মাতিয়ে রেখেছেন কোটি কোটি শ্রোতাকে। শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে পপ, গজল, ভজন কিংবা ক্যাবারে— সব ধরনের গানেই তাঁর অবাধ বিচরণ। ভারতের এই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে মারা গেছেন। রোববার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সংগীতের ইতিহাসে আশা ভোঁসলে একটি অনিবার্য নাম। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার একটি সংগীত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। আশা ভোঁসলে এবং তাঁর বড় দিদি লতা মঙ্গেশকর— দুজনেই ভারতীয় সংগীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তবে লতা মঙ্গেশকরের স্নিগ্ধ ও ধ্রুপদী ধারার বিপরীতে আশা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য, সাহসিকতা এবং আধুনিকতার সমন্বয়ে।

আশার যখন মাত্র ৯ বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এরপর তাঁদের পুরো পরিবারকে কোলহাপুর থেকে পুনে এবং পরে মুম্বাইয়ে চলে আসতে হয়। পরিবারের আর্থিক অনটনের মুখে আশা ও তাঁর দিদি লতা খুব অল্প বয়সেই চলচ্চিত্রে গান গাওয়া এবং অভিনয় শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে ‘মাঝা বাল’ (মারাঠি) চলচ্চিত্রে ‘চল চল নব বালা’ গানের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। হিন্দিতে তাঁর প্রথম গানটি ছিল ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ চলচ্চিত্রের ‘সাওয়ান আয়া’। তবে শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। তৎকালীন সংগীত জগতে লতা মঙ্গেশকর, শমশাদ বেগম এবং গীতা দত্তের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের ভিড়ে আশাকে নিজের জায়গা করে নিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল।

আশা ভোঁসলেকে ‘ভার্সাটাইল’ বা বহুমুখী গায়িকা বলা হয় কারণ তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর গায়কির কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো:

  • রোমান্টিক ও চঞ্চল গান : ‘ও পিয়া পিয়া’ বা ‘ঝুমকা গিরা রে’র মতো গানে তাঁর কণ্ঠের চপলতা অতুলনীয়।

  • শাস্ত্রীয় সংগীত : তিনি যে শুধু আধুনিক গান গাইতেন তা নয়, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ-র সাথে তাঁর শাস্ত্রীয় সংগীতের অ্যালবাম তাঁর গভীর দখলের প্রমাণ দেয়।

  • গজল ও ভজন : ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মাস্তি;-র মতো গজলে তাঁর গায়কি আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়।

  • ক্যাবারে ও পপ : রাহুল দেব বর্মণের সুরে ‘পিয়া তু আব তো আজা’ বা ‘দম মারো দম’ গানের মাধ্যমে তিনি ভারতে পপ সংগীতের ধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।

কিংবদন্তি জুটি : আশা ও আর. ডি. বর্মণ

আশা ভোঁসলের জীবনের এবং সংগীতের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন সুরকার ও তাঁর স্বামী রাহুল দেব বর্মণ (পঞ্চম দা)। এই জুটির সৃষ্টি করা গানগুলো আজও চিরসবুজ। ‘তিসরি মঞ্জিল’ থেকে শুরু করে ‘ইজাজত’ পর্যন্ত তাঁদের প্রতিটি কাজ ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভরা। লতা মঙ্গেশকর যখন ধ্রুপদী ও মেলোডি গানের প্রতি বেশি ঝুঁকে ছিলেন, তখন আশা ও পঞ্চমের জুটি ডিস্কো, জ্যাজ এবং রক-অ্যান্ড-রোল সুরকে হিন্দি সিনেমার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিলেন।

সংগীত জগতে তাঁর অতুলনীয় অবদানের জন্য তিনি অগণিত সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যেমন :

  • গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস : ২০১১ সালে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান।

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : তিনি দুইবার শ্রেষ্ঠ গায়িকার জাতীয় পুরস্কার পান (‘উমরাও জান’ ও ‘ইজাজত’ ছবির জন্য)।

  • দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার : ২০০০ সালে তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

  • পদ্মবিভূষণ : ২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণে সম্মানিত করে।

আশা ভোঁসলের জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরা। ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে তিনি গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিচ্ছেদে শেষ হয়। অনেক ব্যক্তিগত শোক এবং চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি কখনো দমে যাননি। তাঁর হাসিখুশি স্বভাব এবং রান্নার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে সংগীত জগতের বাইরেও এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ ৯০ বছর পেরিয়েও তাঁর কণ্ঠের সতেজতা ও প্রাণশক্তি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার গানে তিনি যে আবেগ ঢেলে দিয়েছেন, তা যুগ যুগ ধরে সংগীতপ্রেমীদের পাথেয় হয়ে থাকবে। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি ছাড়াও তিনি প্রায় ২০টি ভাষায় গান গেয়েছেন। বাংলা সংগীতে তাঁর কালজয়ী গান ‘ও পাখি উড়ে যা’ বা ‘আজ নয় গুনগুন’ আজও বাঙালির ঘরে ঘরে বাজে। সুদীর্ঘ সাত দশকের এই যাত্রায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পরিশ্রম, প্রতিভা এবং নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকলে সময়ের সাথে কখনো ফিকে হয়ে যেতে হয় না। তিনি ভারতীয় সংগীতের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাজ্ঞী।

নুরুল ইসলাম বাবুল : শিক্ষক, লেখক ও গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত