অর্থ ও বাণিজ্য, মত-অমত

অর্থ ও বাণিজ্য, মত-অমত

৫০০ টাকার হস্তশিল্প ৫০০০ টাকার সম্মান পায় না কেন?

আমরা পণ্যের ‘দাম’ দিই, কিন্তু ‘মূল্য’ বুঝি না। আমরা লোগো কিনি, কিন্তু কারিগরের জীবন দেখি না। একজন কারিগর যখন কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি নকশি কাঁথা বা শাড়ির জমিনে কয়েকশ শ্রমঘণ্টার নিপুণ ফোঁড়ে একটি নকশা গড়ে তোলেন, তখন সেটি কেবল একটি বস্ত্র থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে এক একটি একক শিল্পকর্ম এবং আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। অথচ যে সৃষ্টিটি তৈরিতে অমানুষিক ধৈর্য ও সময় ব্যয় হয়, বাজারে তার দাম ওঠে বড়জোর ৫০০ টাকা। প্রশ্ন হলো— এই ৫০০ টাকার হস্তশিল্প কেন ৫০০০ টাকার ‘ব্র্যান্ডেড’ পণ্যের সমান মর্যাদা বা আর্থিক মূল্য পায় না? সমস্যাটি যেমন আমাদের হীনম্মন্যতার, তেমনি ত্রুটিপূর্ণ বাজার কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক উদাসীনতার ভেতরে প্রোথিত।

১. শ্রমঘণ্টা বনাম যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি 
মেশিনে তৈরি বা ‘ম্যাস প্রোডাকশন’ (Mass Production)-এ কোনো কারিগরের ব্যক্তিগত স্বাক্ষর থাকে না; সেখানে থাকে নকশার যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি। পক্ষান্তরে, একটি হস্তশিল্পের প্রতিটি ইঞ্চি তৈরি হয় কারিগরের নিবিড় মনোযোগে। শ্রমঘণ্টার দীর্ঘ হিসাব, উপকরণের বিশুদ্ধতা, নকশার মৌলিকত্ব এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনা করলে ৫০০ টাকার সেই পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য হওয়া উচিত ছিল কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু আমরা যখন শ্রমকে কেবল ‘মজুরি’ হিসেবে দেখি, তখন শিল্পের প্রকৃত অবমূল্যায়ন ঘটে। আমরা ভুলে যাই যে, হস্তশিল্পে ব্যবহৃত প্রতিটি ফোঁড় কারিগরের সৃজনশীল সত্তার এক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২. স্ট্যাটাস সিম্বল ও মনস্তাত্ত্বিক দৈন্য 
আমরা যখন বিদেশি পণ্যের কোনো শোরুমে গিয়ে ৫০০০ টাকা দিয়ে একটি সাধারণ টি-শার্ট কিনি, তখন আমরা আসলে কেবল কাপড় কিনি না; আমরা কিনি একটি ‘সামাজিক স্বীকৃতি’ বা ‘সিম্বলিক ক্যাপিটাল’ (সামাজিক মর্যাদার প্রতীকী মূল্য)। ব্র্যান্ডের লোগোটি আমাদের আভিজাত্যের পরিচয় দেয়। অথচ দেশি হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে আমাদের এই আভিজাত্যবোধ উধাও হয়ে যায়। আমরা মনে করি ‘দেশি’ মানেই তা সস্তা হতে হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতার কারণেই বিদেশি ব্র্যান্ডের নিম্নমানের পণ্যও আমরা উচ্চমূল্যে কিনি, কিন্তু দেশি শ্রেষ্ঠ মানের কাজেও ‘এত দাম কেন’ বলে প্রশ্ন তুলি।

৩. মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণ ও ৩০০ শতাংশের ব্যবধান 
কেন কারিগর ন্যায্যমূল্য পান না? কারণ আমাদের বাজার কাঠামোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্য। বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, গ্রামে যে পণ্যটি ৩০০-৫০০ টাকায় সংগৃহীত হয়, শহরের আলোকোজ্জ্বল শোরুমে তা ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় বিক্রি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধির হার ৩০০-৪০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। অথচ এই বর্ধিত লভ্যাংশের বিন্দুমাত্র কারিগরের হাতে পৌঁছায় না। কারিগর যেখানে নিজের শ্রম সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য হন, সেখানে ব্র্যান্ডগুলো সেই শ্রমকে ‘অভিজাত অভিজ্ঞতা’ হিসেবে বিক্রি করে মুনাফা লুটে নেয়।

৪. যাপিত জীবনের লড়াই ও সামাজিক উদাসীনতা 
টাঙ্গাইলের একজন তাঁতি বা জামালপুরের একজন সুঁই-শিল্পী যখন বলেন— ‘তিন মাস ধইরা কাইকশ্রম (শারীরিক শ্রম) দিয়া এই শাড়িটা বুনলাম, অথচ ঘরের চাল ঠিক করার টাকাটাও পাইলাম না’— তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির আক্ষেপ নয়, বরং আমাদের সামাজিক উদাসীনতারই প্রতিধ্বনি। একটি হস্তশিল্পের প্রতিটি ফোঁড়ে মিশে থাকে এক কিশোরীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন কিংবা একটি প্রান্তিক পরিবারের টিকে থাকার শেষ লড়াই। আমরা যখন এই মানবিক আখ্যানগুলোর দাম দিই না, তখন আমরা আসলে নিজেদের শিকড়কেই অস্বীকার করি।

৫. সমাধানের পথ : প্রয়োজন নীতিনির্ভর কাঠামোর 
এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা।

  • সরাসরি বাজার সংযোগ : ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কারিগর ও ক্রেতার সরাসরি সংযোগ ঘটাতে হবে, যেন মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণ বন্ধ হয়।
  • জিআই (GI) ট্যাগিং ও ব্রান্ডিং : আমাদের পণ্যগুলোকে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
  • রাষ্ট্রীয় নীতিমালা : কারিগরদের জন্য একটি জাতীয় ডাটাবেস তৈরি, ন্যায্যমূল্য নীতি এবং রপ্তানি সহায়তার মতো রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
  • সাংস্কৃতিক মালিকানা : ক্রেতা হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে, হস্তশিল্প কেনা মানে কেবল একটি পণ্য কেনা নয়, বরং একটি ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানো।

সম্মান কেবল টাকার অঙ্কে নির্ধারিত হয় না, তা নির্ধারিত হয় আমাদের মনস্তত্ত্বে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিনির্ধারণে। সমস্যাটি কেবল বাজারে নয়, সমস্যাটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও। যেদিন আমরা গর্ব করে বলতে পারব— ‘এটি আমাদের কারিগরের কাজ, এর শ্রম ও মৌলিকতার মূল্য আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি’, সেদিনই শিল্প তার মর্যাদা ফিরে পাবে। প্রশ্নটি কেবল বাজারে নয়, প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেও। আমরা কি প্রস্তুত আমাদের কারিগরদের সেই ন্যায্য সম্মান এবং মূল্যটুকু ফিরিয়ে দিতে?

ফারজানা জিতু : কলাম লেখক; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত