

বাংলা একাডেমি-প্রবর্তিত গবেষণা-বৃত্তির আওতায় তিন মাস মেয়াদি গবেষণা-প্রবন্ধ প্রস্তাবের দ্বিতীয় পর্যায়ে বৃত্তিপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিকদের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী ‘প্রাবন্ধিক কনফারেন্স ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বাংলা একাডেমির শহিদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষ ও কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি, ভাষা ও শিক্ষা, নৃবিজ্ঞান, শিল্পকলা, ইতিহাস ও রাজনীতি, পরিবেশ ও বিজ্ঞান এবং নারী ও নারীবাদ বিষয়ে এই গবেষণা-প্রবন্ধ উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল ৯টায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভবনের নিচতলায় অংশগ্রহণকারীদের রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর শহিদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে কনফারেন্সের সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ও গবেষণা উপবিভাগের উপপরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, উনিশ শত ষাটের দশকে বাংলা ভাষায় গবেষণা প্রণয়ন ও প্রবন্ধ রচনার ব্যাপারে অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে চিত্রের বদল ঘটেছে; এখন অধিকাংশ গবেষক ও অধ্যাপক ইংরেজি ভাষায় গবেষণা প্রণয়নে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন এবং বাংলা ভাষায় গবেষণা প্রণয়নে অনীহা দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপট মাথায় নিয়ে বাংলা একাডেমি বর্তমানে বাংলা ভাষায় গবেষণা প্রণয়নে পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রবণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণা বৃত্তির প্রচলন করেছে। আজ প্রায় ৪০ জন প্রাবন্ধিক বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। তাদের প্রত্যেকের সাথে একজন প্রাবন্ধিক রচনার তত্ত্বাবধায়ক কাজ করেছেন, যার ফলে পদ্ধতিগতভাবে প্রবন্ধের মান উন্নয়ন হয়েছে।
কনফারেন্সের সূচনাপর্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. সেলিম রেজা, উপপরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া ও ইমরুল ইউসুফ। তারা জানান, গত ৭ই জুলাই ২০২৫ তারিখে তিন মাস মেয়াদি গবেষণা-প্রবন্ধ প্রস্তাব (দ্বিতীয় পর্যায়) আহ্বান করে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে জমাকৃত ৫৫৭টি প্রস্তাবের তালিকা ২২শে জুলাই ২০২৫ তারিখে বাংলা একাডেমি ওয়েবসাইট ও ফেসবুক বুস্টিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। বাংলা একাডেমি গবেষণা বৃত্তি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রাথমিক মনোনয়ন এবং বিশেষজ্ঞ-পরীক্ষক কর্তৃক চূড়ান্ত মনোনয়নের মাধ্যমে মনোনীত ৫০ জন গবেষণা-প্রস্তাবের তালিকা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশ করা হয়। ১১ই অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তারা বাংলা একাডেমির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।
বৃত্তি অনুযায়ী প্রত্যেক গবেষকের গবেষণাকার্য তত্ত্বাবধানের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত হন। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের ৪০ জন গবেষক তাদের গবেষণা-তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রণীত প্রবন্ধ সুপারিশপত্র সমেত বাংলা একাডেমিতে জমা দিয়েছেন। ৬ জন সম্পাদক কর্তৃক সম্পাদনাকৃত প্রবন্ধসমূহ গবেষকবৃন্দ সংশোধনপূর্বক চূড়ান্তভাবে জমা দিয়েছেন। এই কনফারেন্সে প্রাবন্ধিকগণের প্রবন্ধের সারবস্তু উপস্থাপনের মাধ্যমে দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সম্পন্ন হলো। অচিরেই তৃতীয় পর্যায়ের নির্বাচিত প্রাবন্ধিকদের নাম প্রকাশ করা হবে।
শহিদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে ও কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে সমান্তরাল অধিবেশনের ৮টি পর্বে মোট ৩৮ জন প্রাবন্ধিক তাদের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক মালবিকা বিশ্বাস ও অধ্যাপক তারেক রেজা। এ পর্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন :
মো. শামীম পারভেজ : ‘দাদা আলী: ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত ধারা’
অধ্যাপক ময়না তালুকদার : ‘সংস্কৃত কাব্যচর্চায় মৈথিলি কবিদের অবদান’
বিলাল হোসেন : ‘বাংলা সাহিত্যে প্রতিবন্ধী চরিত্র: করুণাচর্চা ও সাহিত্যিক নির্মিতি’
গৌরব চৌধুরী: ‘সপ্তদশ শতকে গাছের বাকলে লিখিত ভূমি বিক্রয়ের দলিল: পাঠ ও ইতিহাস বিশ্লেষণ’
ফারুকুল ইসলাম : ‘অষ্টাদশ শতকের কবি ও আধ্যাত্মিক সাধক আলী রজা: এক বিস্মৃত সুফি সাধকের সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক কর্মের পুনর্বিচার’
সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল নবী খান। আলোচক ছিলেন ড. আবদুর রাজ্জাক খান ও মুহাম্মদ তানিম নওশাদ। এ পর্বে প্রবন্ধ পাঠ করেন :
আর্থ সারথী : ‘জৈন সিদ্ধান্তের আলোকে নতুন সমাজ’
মো. আবদুল জলিল : ‘শাড়ি থেকে সালওয়ার কামিজ ও পাশ্চাত্য পোশাকে রূপান্তর: বাংলাদেশি নারীদের পোশাক বাছাইয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা’
মো. আল মামুন : ‘ধামের গান : পুরুষের নারী চরিত্রায়ণ, পরিবেশনশীল লিঙ্গীয় পরিচয় ও নাটকীয় উপাদান বিশ্লেষণ’
হরিদাস ঠাকুর : ‘নমঃশূদ্র সুহৃদ (১৯০৭) পত্রিকার ইতিবৃত্ত ও আর্থসামাজিক প্রভাব অনুসন্ধান’
নাবিলা হক মিতু : ‘নিশকাইন্দা : নবাবগঞ্জ-মাঝিকান্দা অঞ্চলের লোকদেবতার একটি মাইক্রোএথনোগ্রাফি’
সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদুজ্জামান। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক আইনুন নাহার ও মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। এ পর্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন :
শিহাব আহমেদ : ‘উল্টি ভাষা : হিজড়া সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক-ভাষিক পরিচয়’
জান্নাতুল নাইমা : ‘ভূমিহীনতার ভাষা: ঘাসান কানাফানির কথাসাহিত্যে উদ্বাস্তু বাস্তবতা ও ভাষিক প্রতিরোধের রূপায়ণ’
মো. আতাউর রহমান : ‘এনসিটিবি-র নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ভাষার ব্যাকরণ: দুটি বইয়ের তুলনামূলক পর্যালোচনা’
সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক মিঠুন কুমার দে ও ড. শাহমান মৈশান। এ পর্বে প্রবন্ধ পাঠ করেন :
আবু দারদা মাহফুজ : ‘বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলে বসবাসরত চাকমা, গারো ও সাঁওতাল নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য অন্বেষণ আচরণের ধরণ অনুসন্ধান’
মেহেদী হাসান : ‘হদি-মান্দাই গেরাম: একটি বিলুপ্তপ্রায় জনজাতির জন্য সংস্কৃতি সংবেদনশীল গ্রাম-পরিকল্পনা’
আনিকা তাসনিম রাহী : ‘আইন, নজরদারি ও শোষণ: চা শ্রমিকের দৈনন্দিনতা’
সভাপতিত্ব করেন ড. সাইম রানা। আলোচক ছিলেন ড. সাইমন জাকারিয়া ও এগনেস র্যাচেল প্যারিস। এ পর্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন :
আইমান বিন্তে আইয়ুব : ‘বাংলার গহনা : পরিপ্রেক্ষিত বরেন্দ্র অঞ্চল’
চিন্ময় কুমার মল্লিক: ‘নজরুল ও জসীমউদদীনের মধুমালা নাটক : বিষয়-বৈচিত্র্য ও লোকজ প্রসঙ্গ’
লাবণী বন্যা : ‘গৌড়ীয় নৃত্যের রূপ ও রস: টেরাকোটা ভাস্কর্যে (আনু. সপ্তদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দী)’
অতীক তালুকদার : ‘বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে গালির ব্যবহার : প্রাসঙ্গিকতা ও সমাজবাস্তবতা পর্যালোচনা’
সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক এ কে এম জসীম উদ্দীন। আলোচক ছিলেন ড. তপন কুমার পালিত ও আশিকুর রহমান। এ অধিবেশনে প্রবন্ধ পাঠ করেন:
তাহমিনা জান্নাত চাঁদনী : ‘২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী রিকশাচালকদের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের মানসিক কারণ এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী মানসিক অবস্থান’
মোস্তাক আহমদ : ‘খুলনা সিটি করপোরেশনে নারীর ক্ষমতায়ন: সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ’
রাজলক্ষ্মী দাশ : ‘২৪-এর গুলিবিদ্ধ শিশু: ইতিহাস ও নৃশংসতার স্বরূপ’
শাওন সরকার দীপ্ত : ‘ব্রিটিশ বিরোধী আইন-অমান্য আন্দোলনে মুরারিচাঁদ কলেজের সক্রিয়তা’
সামীম আরা : ‘১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ে নারীদের ভূমিকা’
সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মো. নিয়ামুল নাসের। আলোচক ছিলেন ড. মহিবুল ইসলাম খান ও ড. আফসানা হক। এ অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন:
আসিফ হাসান নবী : ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার : দেশের প্রান্তিকপর্যায়ে এই সেবার অপ্রতুলতা, সমস্যা ও সমাধানের সুপারিশ’
মো. রহমতউল্লাহ : ‘বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর : সরিষার খৈল থেকে ফিউরান-মুক্ত সেলুলোজ তৈরির পদ্ধতি ও কম্পিউটেশনাল বিশ্লেষণ’
মোহাম্মদ আলী সিকদার রমীম : ‘বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাছ খাওয়ার প্রবণতা অন্বেষণ: খাদ্যাভ্যাস গ্রহণের হার, প্রেরণা এবং বাধাসমূহ’
সানজিদা আক্তার জিম : ‘লিঙ্গভিত্তিক ও আচরণগত প্রতিবন্ধকতা: ঢাকা শহরের সর্বজনীন টয়লেট ব্যবহার এড়ানোর কারণসমূহ’
মোছা. সাদিয়া আক্তার মুন : ‘বাংলাদেশের কৃষি খাতে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব: একটি সফটওয়্যার নির্ভর আধুনিকীকরণ পদ্ধতির বিশ্লেষণ’
গ্যাব্রিয়েল সুমন : ‘জেমসের গানে কাব্যময়তা, সুফিবাদ ও আবহমান বাংলার লোকজ উপাদান’
সভাপতিত্ব করেন ড. মো. সেলিম রেজা। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক এ. কে. এম. হারুন রশিদ ও অধ্যাপক তাহমিনা আখতার। এ পর্বে প্রবন্ধ পাঠ করেন :
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন : ‘ইজতিহাদ ও ফাতওয়াশাস্ত্রে আরবীয় নারীগণের অবদান (৬০০ খ্রি.-১২০০ খ্রি.) : একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা’
শাহানারা বেগম : ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার হুমকির মুখে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা : টেকনো-ফেমিনিজমের আলোকে বিশ্লেষণ’
সাদিয়া আফরিন : ‘পরিবেশ নারীবাদ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “পোস্টমাস্টার” ও “স্ত্রীর পত্র” গল্পের পুনঃপাঠ’
ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা : ‘“ঘটনা ঘটার মতো করে ঘটে, মামলার মতো করে কিছু ঘটে না” : নারীর অভিজ্ঞতায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধর্ষণ এবং ভিকটিম বডি’
রেবেকা আহমেদ : ‘পাঠ ও পর্দায় নারীর ভৌতিক রূপ : ঠাকুরমার ঝুলির “লালকমল ও নীলকমল” গল্পে রাক্ষসী চিত্রায়ণের শৈল্পিক পাঠ’
আসমা রীথি : ‘বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের নৃ-জাতিগোষ্ঠী নারীদের পানি আহরণ সংকট : একটি বাস্তুতান্ত্রিক গবেষণা’
বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে অংশগ্রহণকারী প্রাবন্ধিকদের মাঝে সনদপত্র প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, সচিব ড. সেলিম রেজা ও উপপরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, বাংলা একাডেমির গবেষণা-বৃত্তিপ্রাপ্ত নবীন ও প্রবীণ গবেষকদের গবেষণা-প্রবন্ধ উপস্থাপন, আলোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, শিল্প, বিজ্ঞান, পরিবেশ ও নারীবিষয়ক সমকালীন গবেষণার বহুমাত্রিক ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি ভবিষ্যতেও গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চা ও প্রবন্ধসাহিত্য বিকাশে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।