বটবাহিনী : অদৃশ্য এক ডিজিটাল দানব

Post Thumbnail

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে যুদ্ধ সব সময় বন্দুক দিয়ে হয় না। অনেক যুদ্ধ হয় মোবাইল ফোনের পর্দায়। কিবোর্ডের আঙুলে। একটি ক্লিকেই।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কী? কেউ বলবেন অর্থনীতি। কেউ বলবেন আইনশৃঙ্খলা। কেউ রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা তুলবেন। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চোখের সামনে যা দেখা যায়, তার চেয়েও বড় বিপদ কখনও কখনও লুকিয়ে থাকে আড়ালে। আজ সেই আড়ালের বিপদের নাম— সোশ্যাল মিডিয়ার বটবাহিনী।

এরা মানুষের মতো কথা বলে। মানুষের মতো মন্তব্য করে। মানুষের মতো তর্কও করে। কিন্তু মানুষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সফটওয়্যার। আবার অনেক সময় কয়েকজন মানুষ শত শত ভুয়া পরিচয় নিয়ে একই কাজ করে। ফলে বাস্তব আর কৃত্রিমের সীমারেখা মুছে যায়।

একটি পোস্ট প্রকাশ হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শত শত মন্তব্য। হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া। মনে হবে পুরো দেশ যেন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে। আসলে কি তাই? সব সময় নয়।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানান, দেশের সাইবার ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ। সংখ্যাটি শুধু বিস্ময়কর নয়, উদ্বেগেরও।

তাঁর এই কথার অর্থ কী? অর্থ হলো, আমরা অনলাইনে যা দেখি, তার বড় একটি অংশ প্রকৃত মানুষের প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে। এই বাস্তবতা না বুঝে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বট কী?

সহজ ভাষায় বললে, এটি একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার। নির্দিষ্ট নির্দেশনা পেলেই কাজ শুরু করে। কোথাও মন্তব্য করবে, কোথাও লাইক দেবে, কোথাও শেয়ার করবে। আবার কোথাও গিয়ে একজন মানুষকে গালিও দেবে।

প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, বটও তত বুদ্ধিমান হচ্ছে। আগে তারা একই বাক্য কপি-পেস্ট করত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়, মানুষের মতো করে মন্তব্য লিখতে পারে। এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

অন্যদিকে রয়েছে হিউম্যান ট্রল আর্মি। এরা আসল মানুষ। কিন্তু পরিচয় ভুয়া। একজন মানুষ ১০টি, ১৫টি, কখনও ২০টি আইডি চালায়। নির্দেশ পেলেই সবাই একসঙ্গে একই পোস্টে হাজির হয়। দেখতে মানুষের ভিড়। বাস্তবে সেটি সংগঠিত ডিজিটাল হামলা।

এই বাহিনীর লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। জনমত বদলে দেওয়া। কোনো ভালো সিদ্ধান্তকে খারাপ প্রমাণ করা। কোনো মানুষকে রাতারাতি খলনায়ক বানিয়ে ফেলা। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা। কখনও আবার উল্টো কাজও হয়। অযোগ্য কাউকে জনপ্রিয় দেখানো হয়। কৃত্রিম প্রশংসায় ভরে ফেলা হয় সোশ্যাল মিডিয়া।

মেটা এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে বলে ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার’ বা সংঘবদ্ধ ভুয়া আচরণ। এরা একযোগে রিপোর্ট করে। একই ভাষায় মন্তব্য করে। একই বার্তা ছড়ায়। ফলে প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমও অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

বট চেনা অসম্ভব নয়। কোনো পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শত শত মন্তব্য এলে প্রশ্ন তুলতেই হবে। দশজন মানুষের মন্তব্য যদি শব্দে শব্দে এক হয়, তাতেও সন্দেহের কারণ আছে।

ভুয়া প্রোফাইলেও কিছু মিল থাকে। নিজের কোনো ছবি নেই। ব্যক্তিগত জীবনের চিহ্ন নেই। টাইমলাইনে শুধু শেয়ার। বাস্তব উপস্থিতির প্রমাণ খুব কম।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি কোথায়? গণতন্ত্রে। কারণ, গণতন্ত্র টিকে থাকে মানুষের মতামতের ওপর। যদি সেই মতামতই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে সত্য নয়, শব্দের ভিড়কে বিশ্বাস করতে শুরু করবে।

মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’। মানুষ দেখে সবাই যেন একদিকে যাচ্ছে। তখন সেও সেই দিকেই হাঁটতে চায়। রাজনৈতিক যোগাযোগে এর আরেকটি নাম আছে— ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’। অর্থাৎ, কৃত্রিমভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যাতে সেটি স্বতঃস্ফূর্ত জনমত বলে মনে হয়। এটি এক ধরনের ডিজিটাল প্রতারণা।

আরও উদ্বেগের বিষয় আছে। ডিপফেক প্রযুক্তিতে ভুয়া ছবি বা ভিডিও বানানো হয়। এরপর সেই কনটেন্টকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বটবাহিনী মাঠে নামে। মিথ্যা তখন শুধু ছড়ায় না, বিশ্বাসও জন্মায়।

এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে তিনটি কাজ জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও গভীরভাবে বুঝতে হবে। শুধু দূর থেকে ব্যবসা করলেই চলবে না। স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার, ট্রল ফার্ম ও ভুয়া নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর সংগঠিত ডিজিটাল হামলা এক জিনিস নয়।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আমাদের নিজেদের। ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বাড়াতে হবে। স্কুল থেকেই তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ শেখাতে হবে।

কারণ, প্রযুক্তি থামবে না। বটও থামবে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যকে চিনতে শিখব? নাকি একদিন এমন হবে, আমাদের মতামতও লিখে দেবে একটি সফটওয়্যার, আর আমরা সেটাকেই নিজের মত বলে বিশ্বাস করব? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।