

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। একদিকে আগে থেকেই ভঙ্গুর হয়ে থাকা অর্থনীতি ও বৈশ্বিক মন্দার চাপ, অন্যদিকে নতুন করে বন্যার এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি—সব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন বহুমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। প্রশ্ন উঠেছে, এই পাহাড়সম চাপ কীভাবে সামলাবে দেশ?
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বর্তমান বিএনপি সরকারকে কঠিন এক পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। সাধারণত নতুন কোনো সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম কয়েক মাস গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা স্বস্তির সময় পায়। কিন্তু আগের অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া থমকে থাকা উৎপাদন, বিনিয়োগ খরা আর কর্মসংস্থান সংকটের কারণে শুরু থেকেই চাপে রয়েছে বর্তমান প্রশাসন। অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ নিলেও চারপাশের পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নেই।
অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির উত্তাপ। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জেরে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় দেশের রপ্তানি ও জনশক্তি বাজারও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। ভোগব্যয় কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে, অনেক উদ্যোক্তা চলতি মূলধনের সংকটে ভুগছেন। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় নিম্নমুখী এবং পুঁজিবাজারেও নতুন বিনিয়োগ আসছে না। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সমাজে বেকারত্বের বিশাল ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চলতি বাজেটে যখন দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধ করে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, ঠিক তখনই আঘাত হেনেছে বন্যা। কৃষিজমি, ফসল, গবাদিপশু, মাছের খামার, বসতবাড়ি ও অবকাঠামোর যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তা আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য মজুত নষ্ট হওয়ায় দেশব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।
সরকারের সামনে এখন একযোগে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ— অতীতের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানো, বৈশ্বিক অভিঘাত সামলানো এবং চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় চ্যালেঞ্জ একা কোনো সরকারের পক্ষে সামলানো অসম্ভব।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় সংহতি। রাজনৈতিক বিভাজন ও মতপার্থক্য ভুলে সরকার, বিরোধী দল, ব্যবসায়ী সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে দেশে এমন একটি সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে বিভাজনের বদলে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই বন্যাকবলিত মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। বাংলাদেশ অতীতেও বহুবার প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগ সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। এবারও সেই ঐক্যবদ্ধ মানবিক শক্তিই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।