যে ইতিহাস ভুলে যাওয়া যায় না

১৯৭১-এর গণহত্যা, প্রতিরোধ ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন

Post Thumbnail

ইতিহাসে কিছু কিছু বাক্য কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; সেগুলো একটি সময়, একটি উন্মত্ত মানসিকতা এবং একটি জাতির রক্তাক্ত স্মৃতির জীবন্ত দলিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নামে প্রচলিত দম্ভোক্তি— ‘পূর্ব পাকিস্তানের জমিনের সবুজকে লালে রাঙাতে হবে’— তেমনই একটি বাক্য। এর উৎস বা শব্দগত সত্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটি যে ১৯৭১ সালের ভয়াবহ গণহত্যা, পোড়ামাটি নীতি এবং একটি জাতির কণ্ঠরোধ করার প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে, সে বিষয়ে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল কেবল একটি সশস্ত্র যুদ্ধের বছর নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও অসামান্য প্রতিরোধের ইতিহাস, যা কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যায় না। একটি গণতান্ত্রিক রায়কে বুটের তলায় পিষে ফেলার যে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত সেদিন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধে বাধ্য করেছিল।

গণতন্ত্রের হত্যা ও গণহত্যার সূচনা
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। গণতান্ত্রিক রীতিতে সেই ফলাফলের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী জনগণের সেই রায় মেনে নেয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে শক্তির মহড়াকে বেছে নেয় তারা। এরই নির্মম পরিণতি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’— যা বাংলাদেশের ইতিহাসে গণহত্যার এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা করে।

অভিযানের শুরু থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক কর্মী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ছিল সেই বর্বরতার এক প্রামাণ্য দলিল। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পুলিশ, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিক নির্বিচারে প্রাণ হারান। সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও, গণহত্যা ও ব্যাপক নির্যাতনের ফলে লাখো মানুষ ভিটামাটি ছেড়ে শরণার্থী হতে বাধ্য হন।

দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা
এই নিদারুণ দমন-পীড়নে পাকিস্তানি জান্তা একা ছিল না; তাদের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয় এ দেশীয় রাজাকার, আলবদর ও আল-শামস বাহিনী। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণায় প্রমাণিত, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের বহু নেতা-কর্মী এসব বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তারা কেবল সামরিক সহায়তাই দেয়নি, বরং স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ, স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে শনাক্ত করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত ছিল।

বিশেষ করে যুদ্ধের শেষ লগ্নে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ইতিহাসে এক ক্ষমার অযোগ্য ট্র্যাজেডি। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদদের এই হত্যাকাণ্ড ছিল সদ্য জন্ম নিতে যাওয়া একটি রাষ্ট্রের মেধা ও মননকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।অ

মুক্তিযুদ্ধ এবং চিরন্তন ‘গণতন্ত্রের প্রশ্ন’
বাংলাদেশের মানুষের কাছে ১৯৭১ কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ। তবে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাবলিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল শিক্ষাটি আবর্তিত হয়েছে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নকে ঘিরে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল এমন এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, যেখানে মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা যে কেবল জনগণের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত— এই নীতিই মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা।

স্বাধীনতার চেতনা বনাম কর্তৃত্ববাদ
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রাপথ সব সময় এই আদর্শের সমান্তরালে চলেনি। বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত করা, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহি সংকুচিত করার অভিযোগ উঠেছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেই কোনো রাজনৈতিক দল চিরদিন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন শাসনামলে বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হওয়া, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের বাকস্বাধীনতা খর্ব হওয়া এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এসব সমালোচনাকে কোনোভাবেই ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসব প্রশ্নের ভিত্তি হলো— যে মূল্যবোধের ওপর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত, তা প্রতিটি সরকারের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার অধিকার দেয়নি; বরং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান : নতুন প্রতিরোধ
যে জাতি কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতিকেই পরবর্তী সময়ে বারবার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান।

ইতিহাসের অন্যান্য গণআন্দোলনের মতো এটিকেও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারে, তবে বাস্তবতা হলো— কোনো গণআন্দোলনের একক মালিকানা কোনো দল দাবি করতে পারে না। এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। তাই জুলাইয়ের ঘটনাবলির মূল্যায়ন কেবল ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হলো, নাগরিক স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত হলো এবং জবাবদিহি কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো— সেই ‘গণতন্ত্রের প্রশ্ন’-এর উত্তরের মাঝেই নিহিত থাকবে।

শেষা কথা
ফরমান আলীর নামে প্রচলিত সেই দম্ভোক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। সেই শিক্ষা হলো— যখন কোনো সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে অস্বীকার করে এবং সংলাপের পরিবর্তে বলপ্রয়োগকে বেছে নেয়, তখন রাষ্ট্র ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে সেই নির্মম গণহত্যার স্মৃতি যেমন মুছে ফেলা যাবে না, তেমনি ভোলা যাবে না জনতার অভাবনীয় প্রতিরোধের কথাও। অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি প্রতিদিন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও জবাবদিহির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই হবে একাত্তরের শহীদদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা। কারণ, তাঁরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কেবল একটি স্বাধীন ভূখণ্ড নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্র— যেখানে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ ভিত্তি।