বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে নীতিগত আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং এটি আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা কাঠামোর ভিত্তি নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে। চার বছর মেয়াদি এই প্রোগ্রামের মাঝপথে, অর্থাৎ দুই বছর শেষে একটি ‘সার্টিফিকেট’ দেওয়ার প্রস্তাব আপাতদৃষ্টিতে নমনীয়তা হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, বাস্তবে এটি একটি সুসংগঠিত Applied Engineering Education-কে ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধান-২০২২ অনুযায়ী, এই প্রোগ্রামের সময়কাল চার বছর, যা মোট আটটি সেমিস্টারে বিভক্ত এবং একটি নির্দিষ্ট ক্রেডিট ও দক্ষতা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এই কাঠামো নিজেই প্রমাণ করে যে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধাপে ধাপে দক্ষতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি সেমিস্টার পরবর্তী সেমিস্টারের জন্য ভিত্তি তৈরি করে।
এই প্রোগ্রামের শিক্ষাগত বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম দুই বছর মূলত একটি foundation stage। এখানে শিক্ষার্থীরা গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, বেসিক ইলেকট্রিসিটি, ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং, ভাষাগত দক্ষতাসহ নানা মৌলিক জ্ঞান অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম সেমিস্টারের বিষয়গুলোর মধ্যেই রয়েছে Mathematics, Chemistry, Basic Electricity, Engineering Drawing, যা মূলত একটি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে।
এই পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী এখনো বাস্তব ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যার সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে না; সে কেবল প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দ্বিতীয় বছরের শেষ পর্যন্ত কিছু applied বিষয় যুক্ত হলেও, তা এখনো learning stage-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থী তখনো industry-ready নয়। প্রকৃত দক্ষতা তৈরি হয় তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে, যেখানে সে system-level understanding, troubleshooting capability, industrial attachment, project work ইত্যাদির মাধ্যমে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই পর্যায়েই একজন শিক্ষার্থী ‘শেখা’ থেকে ‘কাজে প্রয়োগ’ পর্যায়ে প্রবেশ করে।
এই বাস্তবতায় দুই বছরের মাথায় একটি সার্টিফিকেট প্রদান করা মানে একটি অসম্পূর্ণ শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এটি এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করবে, যেখানে শিক্ষার্থী না ইঞ্জিনিয়ার, না পূর্ণাঙ্গ টেকনিশিয়ান; বরং একটি মধ্যবর্তী, অস্পষ্ট অবস্থায় থেকে যাবে। শ্রমবাজারের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অকার্যকর, কারণ কোনো ইন্ডাস্ট্রি ‘অর্ধেক দক্ষতা’ গ্রহণ করতে চায় না।
নীতিগতভাবে এই প্রস্তাবের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এটি বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই দুই বছর মেয়াদি টেকনিশিয়ান তৈরির একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে, যেমন HSC (Vocational) এবং Technical School and College (TSC)। এই ট্র্যাকগুলো entry-level skill development-এর জন্য ডিজাইন করা। সুতরাং, একটি পূর্ণাঙ্গ ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের ভেতরে একই ধরনের একটি স্তর ঢোকানো মানে দুটি ভিন্ন শিক্ষা-পথকে জোরপূর্বক একত্র করা, যা একটি কাঠামোগত জগাখিচুড়ি তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিকভাবে engineering education একটি সুস্পষ্ট স্তরভিত্তিক কাঠামোতে পরিচালিত হয়: Technician, Technologist (Associate Engineer), এবং Professional Engineer। European Qualifications Framework (EQF), Australian Qualifications Framework (AQF), এবং Dublin Accord—সবক্ষেত্রেই প্রতিটি স্তরের জন্য আলাদা সময়কাল, আলাদা competency এবং আলাদা learning outcome নির্ধারিত। কোনো পূর্ণাঙ্গ ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের মাঝপথে artificial exit point তৈরি করা সেখানে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এতে competency progression ভেঙে যায় এবং শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই প্রস্তাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর behavioral impact। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যেখানে early exit-এর সুযোগ থাকে, সেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সেই সুযোগ গ্রহণ করে। ফলে ধীরে ধীরে চার বছরের ডিপ্লোমা প্রোগ্রামটি কার্যত দুই বছরের কোর্সে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে mid-level engineering workforce-এর ঘাটতি তৈরি হবে, যা দেশের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং একটি কোর্স নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ দক্ষতা গড়ে তোলার যাত্রা। এর প্রতিটি ধাপ অপরিহার্য এবং পরস্পরনির্ভরশীল। এই ধারাবাহিকতা ভেঙে দিলে পুরো কাঠামোই দুর্বল হয়ে যায়।
চার বছরের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো সাধারণ শিক্ষা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইঞ্জিনিয়ারিং পরিচয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এর প্রথম দুই বছর কোনো গন্তব্য নয়; এটি প্রস্তুতি মাত্র। আর এই প্রস্তুতিকেই যদি চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে আমরা দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করব না; বরং অর্ধদক্ষ জনশক্তির একটি বিভ্রান্তিকর ব্যবস্থা তৈরি করব, যা কোনোভাবেই জাতীয় উন্নয়নের জন্য সহায়ক হতে পারে না।
লেখক : কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

