মত-অমত, শিক্ষা

মত-অমত, শিক্ষা

কারিগরি না ইঞ্জিনিয়ারিং?

বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রকৃত পরিচয়, বৈশ্বিক অবস্থান ও উন্নয়নের চালিকাশক্তি

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামকে ঘিরে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—এই শিক্ষা কি কেবল কারিগরি, নাকি এটি প্রকৃত অর্থেই ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার অংশ?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং একটি বহুমাত্রিক এবং কৌশলগত শিক্ষা স্তর, যা একইসাথে কারিগরি শিক্ষা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার একটি অপরিহার্য উপাদান। এই প্রোগ্রামটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত একটি চার বছর মেয়াদি শিক্ষা, যেখানে শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক স্তর সমাপ্তির পর সরাসরি ভর্তি হয় এবং ধাপে ধাপে একটি সংগঠিত, সেমিস্টারভিত্তিক প্রযুক্তিগত ও ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান অর্জন করে। ফলে এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা সাধারণ কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন কোর্স নয়; বরং এটি একটি কাঠামোবদ্ধ, দীর্ঘমেয়াদি এবং পেশাভিত্তিক শিক্ষা, যার বিষয়বস্তু, পাঠ্যক্রম এবং আউটকাম সবই ইঞ্জিনিয়ারিং-সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাপী ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে সাধারণত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়—Professional Engineer, Engineering Technologist এবং Associate Engineer। Professional Engineer সাধারণত তাত্ত্বিক ও নকশাভিত্তিক উচ্চতর জ্ঞানসম্পন্ন, যারা নতুন ধারণা, ডিজাইন ও সিস্টেম উন্নয়নে কাজ করেন। অন্যদিকে Engineering Technologist এবং Associate Engineer স্তরের পেশাজীবীরা মূলত সেই ডিজাইন ও ধারণাগুলোর বাস্তবায়ন, অপারেশন এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং এই মধ্যবর্তী স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে বা Associate Engineer, যেখানে তত্ত্বের পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগের উপর জোর দেওয়া হয়। ফলে এটি প্রকৃতপক্ষে একটি Applied Engineering Education, যা ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানের ব্যবহারিক রূপায়ণ নিশ্চিত করে।

এই স্তরটি ছাড়া কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে না, কারণ ডিজাইন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করার জন্য একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত workforce অপরিহার্য। বাংলাদেশের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকা এই তাত্ত্বিক কাঠামোকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। তারা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে, যেমন: বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, টেলিকমিউনিকেশন, শিল্প উৎপাদন এবং নির্মাণ কাজে সরাসরি যুক্ত থাকেন এবং মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব পালন করেন।

সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তারা সরকারি কাঠামোতে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং বাস্তবিক অর্থে ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেমের কার্যকর পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা রাখেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা একটি প্রকল্পের পুরো execution phase পরিচালনা করেন, টিম লিড করেন এবং ফিল্ড পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো সহায়ক বা প্রান্তিক শিক্ষা নয়; বরং এটি ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার একটি কেন্দ্রীয় ও কার্যকর স্তর।

এছাড়াও, ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কেবল একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত অগ্রগতির পথও তৈরি করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা পরবর্তীতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে বা চাকরির অভিজ্ঞতার মাধ্যমে Assistant Engineer, Executive Engineer এমনকি উচ্চতর প্রশাসনিক বা নীতিনির্ধারণী পদেও উন্নীত হন। অর্থাৎ এটি একটি dead-end শিক্ষা নয়; বরং এটি একটি dynamic pathway, যা একজন শিক্ষার্থীকে ধাপে ধাপে উচ্চতর পেশাগত অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার আলোকে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংকে স্পষ্টভাবে কারিগরি শিক্ষা বা টেকনিক্যাল এডুকেশনের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৬৭ সালের টেকনিক্যাল এডুকেশন আইনে “Diploma in Engineering or Technology”-কে টেকনিক্যাল এডুকেশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং National Skills Development Policy 2011-এ এটিকে Level 6 qualification হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। বিশ্বব্যাপী engineering education তিনটি প্রধান Accord দ্বারা স্বীকৃত—Washington Accord, Sydney Accord এবং Dublin Accord। বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে Dublin Accord-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা প্রমাণ করে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত engineering education framework-এর অংশ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং উন্নয়ন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। একটি দ্রুত উন্নয়নশীল, শিল্পায়নমুখী অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী mid-level engineering workforce অপরিহার্য—আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা।

তবে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি পরিচয়গত নয়, বরং গুণগত। ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংকে ইঞ্জিনিয়ারিং বলা হবে নাকি কারিগরি শিক্ষা বলা হবে—এই বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই শিক্ষার মান কতটা উন্নত করা যায়। গুণগত উন্নয়নের এই প্রশ্নে আমাদের শুধু পাঠ্যক্রম বা ল্যাব সুবিধার দিকে তাকালেই চলবে না; বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার বিদ্যমান কালচার, প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেম, শিল্পখাতের সাথে বাস্তব সংযোগ এবং কারিগরি শিক্ষা নিয়ে গবেষণার গভীরতা—সবকিছুই সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। একইসাথে কারিগরি শিক্ষায় যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে, তার একটি সুসংগঠিত impact analysis প্রয়োজন, যাতে বোঝা যায় এই বিনিয়োগ বাস্তবে দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতায় কতটা প্রভাব ফেলছে। সর্বোপরি, কারিগরি শিক্ষা শুধু একটি একাডেমিক কাঠামো নয়; এটি সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শিল্প—এই সমগ্র ইকোসিস্টেমের মধ্যে একটি ইতিবাচক ও টেকসই cultural development তৈরি করার প্রক্রিয়া। এই সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে, প্রকৃত অর্থে গুণগত মান বৃদ্ধি সম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংকে একটি সংকীর্ণ সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। এটি কেবল কারিগরি শিক্ষা নয়, আবার সম্পূর্ণরূপে তাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাও নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত Applied Engineering Education, যা বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং কাঠামোর একটি অপরিহার্য এবং কৌশলগত স্তম্ভ। এই স্তম্ভকে শক্তিশালী করা মানে শুধু একটি শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা নয়; বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক স্থানে সঠিক স্তরের ইঞ্জিনিয়ার—আর সেই কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, যা দেশের শিল্প, প্রযুক্তি এবং অর্থনীতির অগ্রগতির একটি মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ঢাকা

লেখক : কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত