জাতীয়, লিড নিউজ

জাতীয়, লিড নিউজ

চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর ও তিস্তা প্রকল্প : ঢাকার সামনে কোন কোন চ্যালেঞ্জ?

চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব সামনে এনেছে বেইজিং। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ এখনো এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না জানালেও, অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে প্রস্তাবটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে সরকার।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, সরকার চীনের এই প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করে দেখছে। পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নেও কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

করিডোরের সম্ভাব্য রুট ও প্রেক্ষাপট

সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রগুলোর তথ্যমতে, প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয়ে পৌঁছাবে। সেখান থেকে করিডোরটি দুই ভাগে বিভক্ত হবে—একটি অংশ যাবে ইয়াঙ্গনে এবং অপরটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পরবর্তীতে রাখাইন থেকে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এটি সরাসরি যুক্ত হবে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সাথে।

এ ধরনের আঞ্চলিক যোগাযোগের ধারণা নতুন নয়। এর আগে ২০১৩ সালে চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়ে। এবার মূলত ভারতকে পাশ কাটিয়ে মিয়ানমারের সাথে করিডোর তৈরি করে সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার কৌশল নিয়েছে বেইজিং।

ভেতরের বাধা: মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট

বিশ্লেষকরা করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন। বর্তমানে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র তীব্র সংঘাত চলছে এবং বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

এর পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। এই দুই সংকটের দৃশ্যমান সমাধান না হলে প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

চ্যালেঞ্জ থাকলেও এই করিডোরকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, মিয়ানমার সংকট থাকা সত্ত্বেও চীন যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তবে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য বিরাট সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশচীনের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের জোট আসিয়ানের (ASEAN) সাথেও যুক্ত হতে পারবে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এই করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হবে দেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থাকে (মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশন) আরও সমৃদ্ধ করা। পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সহজ হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগ ব্যাপক হারে বাড়বে।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণ

এই করিডোর ও চীনা বিনিয়োগকে ঘিরে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা:

  • ভারতের প্রতিক্রিয়া : এক যুগ আগে ভারত বিসিআইএম করিডোরে আপত্তি জানিয়েছিল। এখন ভারতকে বাদ দিয়ে এই নতুন রুটে বাংলাদেশ যুক্ত হলে, তা ভারতের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

  • যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সাথে এমন চুক্তিতে যেতে পারবে না যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই শর্তটি মূলত চীন ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করেই দেওয়া। ফলে করিডোরে যুক্ত হলে বা চীনের প্রভাব বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।

তবে হুমায়ুন কবিরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে নিজেইচীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। আর পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক সমীকরণও দক্ষ কূটনীতি ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সামলানো সম্ভব।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের আগ্রহ ও সরকারের অগ্রাধিকার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হলো তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন। দীর্ঘ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পে কারিগরি ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দিতে চীন প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

প্রধানস্থানের কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপেই চীন সহায়তা করতে চায়। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই চীন উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে যুক্ত এই মেগা প্রকল্পে এগিয়ে এসেছে।

তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল

  • বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূরীকরণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ।

  • রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার কৃষিখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উৎপাদন বৃদ্ধি।

  • নদীর গভীরতা বাড়িয়ে এবং বিস্তৃতি কমিয়ে শত শত একর ভূমি পুনরুদ্ধার, যা ভূমিহীনদের পুনর্বাসন ও শিল্পায়নে ব্যবহৃত হতে পারে।

  • নদীভাঙন রোধ এবং নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটন খাতের বিকাশ।

উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও চীনের সহায়তায় এই প্রকল্পের কিছু কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তা আর এগোয়নি। ভারত থেকে আসা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও এক দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতে আটকে আছে। এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতকে আস্থায় নেওয়া বা তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এড়ানোর কৌশলও ঢাকাকে বের করতে হবে।

কূটনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যে ‘দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত’ সম্পর্ক তৈরির বার্তা দেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন-ভারত—এই ত্রিমুখী বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বহুমুখী সমীকরণকে বাংলাদেশ কতটা সাবলীলভাবে নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবে, তার ওপরেই নির্ভর করছে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ।

বিষয়:
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত