
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাত আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লাগামহীনভাবে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ এবং অর্থপাচারের ঘটনা পুরো অর্থনীতিকেই অত্যন্ত নাজুক করে তুলেছে। তবে এই সংকট নিয়ে কেবল হা-হুতাশ করার বা সমস্যা চিহ্নিত করার সময় এখন আর নেই; বরং অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার জন্য বাস্তবসম্মত, টেকসই ও কঠোর সমাধানের দিকে এগোতে হবে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে এখন প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার এবং তার নির্মোহ বাস্তবায়ন।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা প্রদান এবং তার আইনি ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা অনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। যারা জনগণের আমানতের টাকা নিয়ে বছরের পর বছর ফেরত দিচ্ছেন না, সেইসব ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের’ বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের সর্বোচ্চ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মতো দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার সাহস না পায়।
কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে আমূল পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। ব্যাংকগুলোর পর্ষদে রাজনৈতিক বা পরিবারতান্ত্রিক বিবেচনায় নিয়োগের পরিবর্তে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মন্দ বা খেলাপি ঋণগুলো ব্যবস্থাপনা ও আদায়ের জন্য একটি স্বাধীন ‘ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন অথবা একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সরকারকে এখনই নিতে হবে। ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে ঋণ দেওয়ার আগেই জালিয়াতি বা অনিয়ম ধরা পড়ে।
একটি দেশের অর্থনীতি কখনোই একটি দুর্বল ও বিশৃঙ্খল ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভর করে টেকসই হতে পারে না। ব্যাংকিং খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে হলে সরকারকে সবার আগে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির ভিত্তিতে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলেই কেবল সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কারের পথে হাঁটবেন এবং সাধারণ আমানতকারীদের অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।