লিড নিউজ, স্বাস্থ্য

লিড নিউজ, স্বাস্থ্য

হামের পর এবার ডেঙ্গু আতঙ্ক : জুলাই-সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা

দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতির উন্নতি হতে না হতেই হাসপাতালগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। সরকারি হিসাবে, এ জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে অর্ধেকই সংক্রমিত হয়েছে গত এক মাসে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও আগের কয়েক মাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।

সামনের কয়েক মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও নিহতের সংখ্যা বেড়ে পরিস্থিতি ‘মারাত্মক রূপ’ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মশা গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘বিশেষ করে, চলতি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। ওই সময় আক্রান্ত এবং মৃত্যু, উভয়ই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামনে যে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, সরকারও সেটি স্বীকার করছে। সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘গত দুইমাস ধরে জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত আমরা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে আসছি। এছাড়া মশার লার্ভা মারার জন্য একটা বিশেষ ট্যাবলেট পাওয়া যায়। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেগুলো আমরা যোগাড় করতেছি লার্ভা মারার জন্য।’

পাশাপাশি ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঠেকাতে সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখাসহ চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

হাসপাতালের চিত্র
ঢাকার বাসাবো এলাকার একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাইয়াজ আহমেদ রাতুল। তিনদিন আগে হঠাৎ তার শরীরে তীব্র জ্বর দেখা দেয়। ওষুধ খাওয়ানোর পরও তাপ কমার লক্ষণ না দেখে পরদিন তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় তার পরিবার। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন, শিশুটি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত।

রাতুলের মা রেবেকা খাতুন বলেন, ‘এটা শোনার পর আর বাসায় যাইনি। ছেলের সঙ্গে গত দুইদিন হাসপাতালে আছি।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছর আড়াইশ’র বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও প্রাণে বাঁচানো যায়নি অন্তত দুজনকে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডজনখানেক ডেঙ্গুরোগী ভর্তি রয়েছেন, যাদের প্রায় সবাই এসেছেন চলতি সপ্তাহে।

ঢাকার অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশেষ করে গত এক সপ্তাহ যাবত প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গু ওয়ার্ডে নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে সংক্রমিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজারই আক্রান্ত হয়েছে গত জুন মাসে। ওই একমাসে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে ১৯ জন হয়েছে।

অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ এবং রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অন্তত পাঁচজন মারা গেছে।

বেড়েছে লার্ভা
বাংলাদেশে প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। সেজন্য বর্ষার আগেই এডিস মশার প্রজনন ও ঘনত্বের ওপর জরিপ চালিয়ে পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি বছর ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে আলাদা জরিপ পরিচালিত হয়েছে। তিন জরিপেই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি মাত্রায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক বাশার বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেখানে ব্রুটো ইনডেক্স থাকে ১০ বা ১২, এবছর সেটা দ্বিগুণ-তিনগুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।’

ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই) দিয়ে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জরিপে নর্দমা, নালা, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোল, বাড়ির বেজমেন্টসহ প্রজননস্থলে লার্ভার বিআই গড়ে ৪০-এর ওপরে পাওয়া গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই বিআই ছিল ২০-এর ওপর।

অন্যদিকে, ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে পরিচালিত জরিপে কক্সবাজারে ৪৩, বরিশালে ৩৪ এবং পিরোজপুরে প্রায় ৪৩ বিআই পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক বাশার বলেন, ‘এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ধ্বংস করা না হলে এসব লার্ভা থেকে এডিস মশা জন্ম নিয়ে আগামী দুই মাসের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশ খারাপ পর্যায়ে চলে যেতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি।’

এডিস মশা বাড়ছে কেন?
ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার বংশবিস্তার ক্রমেই বাড়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক বাশার বলেন, ‘এর একটি হচ্ছে এডিস মশার জন্য অনুকূল আবহাওয়া। উচ্চ তাপমাত্রা এবং ঘন ঘন বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। তখন এডিস মশা গিয়ে সেখানে ডিম পাড়ে এবং সহজে বংশবিস্তার করে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লার্ভাগুলো ধ্বংস করা গেলে মশার বংশবিস্তার নিয়ে চিন্তার কিছু থাকে না। কিন্তু সেগুলো নষ্ট করতে না পারলেই বিপদ দেখা দেয়।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, “আমাদের এখানে সেটাই বেশি হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে স্থানীয় সরকার ভেঙে পড়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধিরা নেই। ফলে মশা নিধনের কাজ সেভাবে হয়নি। সেজন্যই মশা বেড়ে গেছে।”

কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও শঙ্কা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে যেভাবে বেগ পেতে হচ্ছে, এর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘আর বিপর্যয় নেমে আসা মানেই বহু মানুষের নিশ্চিত মৃত্যু। এগুলো ভালোমত মোকাবিলা করার প্রস্তুতি ও দক্ষতা সরকারের নেই। সেজন্য বিপর্যয় ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম মশা নিধনের বিষয়ে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছি। এটিকে একটি জরুরি নাগরিক সেবা ও জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি।’

তিনি জানান, জরিপের ফলাফল আমলে নিয়ে ঢাকা দক্ষিণে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ২৭টি ওয়ার্ডে গত মাসে পাঁচদিন ব্যাপী ‘মশক নিধন ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে, মাঝারি ও সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতেও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।

হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড রাখা হয়েছে। এছাড়া জ্বর কমে গেলেও সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীকে ছাড়পত্র না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্লাজমা লিকেজ হয়ে রোগীর মৃত্যু ঠেকানো যাবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত