অর্থ ও বাণিজ্য

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টেথোস্কোপ থেকে স্টার্টআপ : মালয়েশিয়া প্রবাসী ডা. তাজরীনের স্বপ্নের পথচলা

দেশে তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক। রোগী দেখতেন, প্রেসক্রিপশন লিখতেন, হাসপাতালের ব্যস্ত দিন কাটত মানুষের সেবায়। কিন্তু ২০১৮ সালে জীবনের মোড় ঘুরে যায়। স্বামীর সঙ্গে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর পর হঠাৎ করেই বদলে যায় পরিচিত জীবন। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, ছোট্ট সন্তান, পরিবারের সহায়তার অভাব— সব মিলিয়ে চিকিৎসক হিসেবে পেশাজীবন চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি।

অনেকের মতো থেমে যাননি তিনি। বরং নতুন বাস্তবতাকেই নতুন সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ঘরে বসেই শুরু করেন উদ্যোক্তা জীবন। আজ তিনি একদিকে ডার্মাটোলজিস্ট-রিকমেন্ডেড অথেনটিক ও হালাল স্কিন কেয়ার পণ্য নিয়ে কাজ করছেন, অন্যদিকে শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়ক শিক্ষামূলক খেলনা, মালয়েশিয়ান হিজাব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পণ্যের প্রি-অর্ডার সেবা দিচ্ছেন। তাঁর এই যাত্রার পেছনে আছে সংগ্রাম, পরিকল্পনা, ধৈর্য আর মানুষের উপকারে কিছু করার তাগিদ।

রোজকার খবরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা জিতুর সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের উদ্যোক্তা জীবনের নানা বাঁক, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মালয়েশিয়া প্রবাসী উদ্যোক্তা ডা. তাজরীন। উদ্যোক্তাদের জীবন ও ভাবনা নিয়ে শিল্পপুরাণ ও আরশিনগরের সৌজন্যে রোজকার খবরের নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হল এই বিশেষ প্রতিবেদন।

তাজরীন জানান, উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকে ছিল না। বরং পরিস্থিতিই তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে।

মালয়েশিয়ায় আসার পর ছোট সন্তানের দেখাশোনার জন্য বাইরে গিয়ে চাকরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময় এক ডার্মাটোলজিস্ট বন্ধু তাঁর কাছে ভালো মানের স্কিন কেয়ার পণ্য সংগ্রহ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেই ছোট্ট অনুরোধই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

ডা. তাজরীন বলেন, বিদেশে সবকিছুই ছিল নতুন। কোথা থেকে পণ্য সংগ্রহ করবেন, কীভাবে দেশে পাঠাবেন, কিছুই জানা ছিল না। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, এমন একটি কাজ করতে হবে, যা ঘরে বসেই করা সম্ভব এবং পরিবারকেও সময় দেওয়া যাবে। সেখান থেকেই শুরু।

আজ তাঁর উদ্যোগের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও চীন থেকে আমদানিকৃত অথেনটিক এবং হালাল স্কিন কেয়ার পণ্য বাংলাদেশের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক খেলনা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পণ্যও সরবরাহ করছেন।

তবে উদ্যোক্তা হওয়ার আগেই আরেকটি স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর একটাই ইচ্ছা ছিল—ডাক্তার হবেন। পরিবারের সবাইও বিশেষ করে তাঁর বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে চিকিৎসক হিসেবে দেখতে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনও শুরু করেছিলেন। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা তাকে আরেকটি নতুন পরিচয় দিয়েছে—উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, চিকিৎসক পরিচয় তাঁর জীবনের গর্ব, আর উদ্যোক্তা পরিচয় তাঁর সংগ্রামের অর্জন।

প্রবাসজীবনে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবার।

স্বামী নিয়মিত চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই পণ্য সংগ্রহ কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে থাকা তাঁর মা দেশের ভেতরের ডেলিভারি কার্যক্রম সামলান। পরিবারের এই সমন্বয় না থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক কঠিন হয়ে যেত বলে মনে করেন তিনি।

তবে সবকিছুর মধ্যেও সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল সময়ের সঙ্গে।

বিদেশে গৃহকর্মী বা পারিবারিক সহায়তা ছাড়া সন্তানদের স্কুল, পড়াশোনা, রান্নাবান্না, সংসারের দায়িত্ব সামলে আবার ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ নয়। তার ওপর অনলাইন ব্যবসায় নিয়মিত মার্কেটিং, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, দুই দেশের সময়ের পার্থক্য এবং নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অনেক সময় কাজ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

তবুও থেমে যাননি।

ডা. তাজরীন বলেন, উদ্যোক্তা জীবনে ব্যর্থতা অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁরও ব্যর্থতা এসেছে বিভিন্নভাবে। কখনও প্রতারণার শিকার হয়েছেন, কখনও ডেলিভারি কোম্পানির অসহযোগিতার মুখে পড়েছেন, কখনও বিদেশ থেকে পণ্য আনতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ পরিচালনা নিয়েও নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

তিনি বলেন, শুরুতে এসব ঘটনা মানসিকভাবে ভেঙে দিত। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝেছেন, উদ্যোক্তাকে সবসময় বিকল্প পরিকল্পনা হাতে রাখতে হয়। এখন প্রতিটি সম্ভাব্য সমস্যার জন্য আগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন।

শুধু ব্যবসা নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধও তাঁর উদ্যোগের অন্যতম ভিত্তি।

স্কিন কেয়ার নিয়ে কাজ শুরু করার সময় বাংলাদেশে অথেনটিক পণ্যের তুলনায় নকল ও ক্ষতিকর প্রসাধনীর বিস্তার ছিল অনেক বেশি। চিকিৎসক হিসেবে তিনি দেখেছেন, স্টেরয়েডযুক্ত বা ক্ষতিকর উপাদানের ক্রিম ব্যবহার করে অনেকেই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

এই বাস্তবতা থেকেই তিনি ব্যবসার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজও শুরু করেন। কোন পণ্য নিরাপদ, কীভাবে ত্বকের যত্ন নিতে হবে, কোন উপাদান ক্ষতিকর—এসব বিষয়ে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি।

একইভাবে শিশুদের শিক্ষামূলক খেলনা নিয়েও কাজ করছেন সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে।

তাঁর ভাষায়, শিশুদের হাতে সারাক্ষণ মোবাইল তুলে দেওয়ার পরিবর্তে এমন খেলনা প্রয়োজন, যা তাদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও শেখার ক্ষমতা বাড়ায়। তিনি মনে করেন, এই সংস্কৃতি সমাজে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তরুণদের জন্যও তাঁর রয়েছে স্পষ্ট বার্তা।

তিনি মনে করেন, শুধু চাকরির পেছনে ছোটা নয়, প্রত্যেকেরই অন্তত একটি বিকল্প আয়ের উৎস থাকা উচিত। চাকরিজীবীরাও চাইলে সাইড বিজনেস করতে পারেন। এতে যেমন ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, যে বিষয়ে নিজের দক্ষতা সবচেয়ে বেশি, সেই বিষয় নিয়েই শুরু করা উচিত। শুধু অন্যকে দেখে ব্যবসায় নামলে দীর্ঘ পথ টিকে থাকা কঠিন। ধারাবাহিকতা, পরিশ্রম এবং শেখার মানসিকতাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বেশ বড়।

তাঁদের ‘Aesthetica Skin Care and Laser Center’-এর বর্তমানে দুটি শাখা রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও শাখা বাড়াতে চান। পাশাপাশি আরও উন্নতমানের হালাল স্কিন কেয়ার পণ্য বাংলাদেশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।

শুধু তাই নয়, শিশুদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাক্টিভিটি ও আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তোলাও তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

বাংলাদেশের জন্য কী করতে চান—এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা।

তিনি বলেন, দেশে শিশুদের সুস্থ বিকাশের পরিবেশ এখনো পর্যাপ্ত নয়। নিরাপদ খেলার জায়গা, সৃজনশীল শেখার সুযোগ এবং মানসম্মত কার্যক্রমের প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি এই খাতে কাজ করতে চান। একই সঙ্গে ক্ষতিকর প্রসাধনী সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

উদ্যোক্তা জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে তিনি অকপটে বলেন, মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে বহুবার ঠকেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই এখন তাঁকে আরও সতর্ক করেছে।

কঠিন সময়ে শক্তি পান মায়ের জীবনসংগ্রামের কথা মনে করে। তাঁর ভাষায়, মা অনেক কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে পরিবারকে আগলে রেখেছেন। তাই নিজের সমস্যাগুলোকে তুলনামূলক ছোট বলেই মনে হয়। তখন নিজেকে বলেন, ‘আম্মু যদি পারেন, আমিও পারব, ইনশাআল্লাহ।’

নিজের জীবনের মূল প্রেরণার কথাও জানালেন তিনি।

‘আল্লাহ আমার জন্য নিশ্চয়ই সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনাই রেখেছেন। আমার কাজ শুধু ধৈর্য ধরে সঠিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।’

বিদেশের মাটিতে একজন চিকিৎসকের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এই গল্প তাই কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যের নয়। এটি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নতুন সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়া এবং নিজের পেশাগত জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ভিন্ন এক পথে ব্যবহার করারও গল্প।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
PhotoCard Icon
Create PhotoCard