
সম্প্রতি তুরাগ নদের আশুলিয়া ঘাটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের সময় ধাওয়া খেয়ে নদীতে ডুবে নিখোঁজের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীকালে ওই নদ থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানারকম গুজব, সন্দেহ এবং সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২২ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তুরাগে ট্রলারযোগে আওয়ামী লীগের একটি মিছিল আশুলিয়া ঘাটে পৌঁছালে সেখান থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আওয়ামী লীগ কর্মীদের অভিযোগ, এ সময় হামলা ও ধাওয়া খেয়ে পানিতে ডুবে তাদের সাতজন কর্মী নিখোঁজ হন। এরপর চার দিনে তুরাগ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশব্যাপী ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ, নিহতের পরিবার এবং মিছিলে অংশগ্রহণকারী একজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
কী ঘটেছিল ২২ জুন?
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিছিলে অংশ নেওয়া এক কর্মী জানান, দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তুরাগ বেড়িবাঁধে পঞ্চবটী এবং রুস্তমপুর ঘাটের মাঝামাঝি এলাকায় মিছিল শেষ করে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে চেয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, দুপুরবেলা মিছিল শেষে ৬০-৬৫ জন কর্মী একসঙ্গে ট্রলারে ওঠেন।
ওই কর্মীর দাবি, ‘আমরা রুস্তমপুর নামার চেষ্টা করছিলাম, পারি নাই। পরে মনে করেছিলাম আশুলিয়ায় যে এলাকায় ট্রলার ভিড়িয়েছি ওই জায়গাটা নিরাপদ হবে। যেহেতু মিছিল শেষ, পুলিশ টহল দিচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা আমাদের খুঁজছে, তাই আমরা নদীপথে নিরাপদ আশ্রয়ে (সেফ এক্সিট) চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।’
তার অভিযোগ, ট্রলার ঘাটে ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আগে থেকে পরিকল্পনা করে পুলিশ এবং বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা তাদের ওপর হামলা চালায়। কর্মীরা দিকবিদিক পালাতে শুরু করেন। সাতজনকে আটক করা হয় এবং আরও কয়েকজন পানিতে ঝাঁপ দেন, যাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে সাতজন নিখোঁজ হন।
তার দাবি, নিখোঁজ সাতজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে আরিফ ও সুমন নামের দুজন সেদিন মিছিলে ছিলেন। বাকি চারজনের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও তারা জীবিত আছেন বলে তথ্য রয়েছে।
আটককৃতদের আইনজীবীর বক্তব্য
আশুলিয়া ঘাট থেকে গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল জানান, ২৮ জুন রিমান্ড শুনানির দিন আসামিদের সঙ্গে তার কথা হয়।
আসামিদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘মিছিলের তথ্য ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। ট্রলার ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ধাওয়া ও হামলা করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় যারা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, তাদের দিকে ইটপাটকেল ছোড়া হয়েছে।’
গ্রেপ্তারকৃতদের দাবি, পুলিশের পাশাপাশি সেখানে সাদা পোশাকের লোকজনও ছিল, যারা বিএনপি-জামায়াতের কর্মী বলে তাদের মনে হয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখা এক প্রত্যক্ষদর্শীও জানিয়েছেন, ওই দিন আশুলিয়া ঘাটে কিছু মানুষকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা তিনি দেখেছেন। তবে পরিস্থিতি বুঝে আতঙ্কে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
বিএনপির স্থানীয় নেতাদের অস্বীকৃতি
হামলায় বিএনপি কর্মীদের উপস্থিতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর বলেন, ‘সেখানে আমাদের কোনো লোক যায়নি। কাদের লোক গিয়েছিল, তা আমি বলতে পারব না।’ স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নূরু সরকারও দাবি করেন, এমন কোনো ঘটনা সম্পর্কে তাদের কর্মীদের জানা নেই।
পুলিশের ভাষ্য
পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি মামলার এজাহারে নিশ্চিত করলেও হামলা বা ধাওয়া খেয়ে নদীতে পড়ে নিখোঁজের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহের সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানায় পুলিশ।
আশুলিয়া থানার এসআই রাশেদুজ্জামান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২২ জুন বিকেল সাড়ে তিনটায় ঘাট এলাকা থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ৪০-৪৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে।
এসআই রাশেদুজ্জামানের দাবি, ‘গ্রেপ্তার অভিযানের সময় কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হয়নি। আমরা যাওয়ার আগেই বাকিরা পালিয়ে যায়। রাজনৈতিক দলের লোকজন হামলা করেছে এমন কাউকে আমরা দেখিনি।’
নিহতদের পরিবারের বক্তব্য
তুরাগে উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে আরিফের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সুমনের পরিবারের পক্ষ থেকে তার খালু জুয়েল বাবু জানান, সুমন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত, তা তারা আগে জানতেন না। নিখোঁজের পর মিছিলের কর্মীদের কাছ থেকে জেনেই তারা থানায় ও নদীতে খোঁজ শুরু করেন।
মরদেহ উদ্ধারের পর সুমনের পকেট থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। মিছিলে থাকা এক কর্মী জানান, ওই মোবাইলগুলোর তিনটি মিছিলের ভিডিও করার জন্য সুমনের কাছে রাখা হয়েছিল।
সুমনের খালু জানান, চারদিন পর উদ্ধার হওয়া মরদেহে কিছু লালচে দাগ ছিল, যা আঘাতের চিহ্ন বলে তাদের সন্দেহ এবং মরদেহের চোখ ছিল না। তবে পরিবার কোনো হত্যা মামলা না করে অপমৃত্যু মামলা করেছে।
জুয়েল বাবু বলেন, ‘পুলিশ বলল, বিএনপির নামে, আওয়ামী লীগের নামে নাকি পুলিশের নামে মামলা করবেন? আমরা বলেছি, না, লাশটা আমাদের দিয়ে দেন। পরে অপমৃত্যু মামলা করে লাশ বুঝে নিই।’
মানবাধিকার কর্মীর মত
একাধিক মৃতদেহ উদ্ধার ও ঘটনা ঘিরে তৈরি হওয়া সংশয় প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘যেহেতু সাতজনকে আটক করা হয়েছে, কয়েকজনের পালানোর চেষ্টা ও পুলিশের ধাওয়া করাটা স্বাভাবিক। পানিতে ডুবে মৃত্যু যেমন হতে পারে, তেমনি পানিতে পিটিয়ে বা ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর পানিতে ফেলে দেওয়ার সন্দেহ করারও যথেষ্ট কারণ আছে। সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশ হওয়া জরুরি।’
সূত্র : বিবিসি বাংলা