শিল্প-সাহিত্য

শিল্প-সাহিত্য

নিন্দুকেরা শক্তিশালী হলেও তারা পরাজিতের বংশধর : তপন বাগচী

ড. তপন বাগচী একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক এবং লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি গবেষক। বাংলা একাডেমির ফোকলোর, জাদুঘর ও মহাফেজখানা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন ফোকলোর চর্চায়। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩-এ ফোকলোর ক্যাটাগরিতে সম্প্রতি পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। তাঁর লেখক হয়ে ওঠা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পুরস্কারসহ নানা বিষয়ে রোজকার খবরের সম্পাদক মেহেদী হাসান শোয়েব কথা বলেছেন এই গুণী লেখক, গবেষকের সঙ্গে।

মেহেদী হাসান শোয়েব : বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন। স্বাভাবিকভাবেই আজকের প্রথম প্রশ্ন এই পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি নিয়েই। আমরা জানি বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য আপনার নাম অনেক বছর ধরেই প্রস্তাব আসছিল। কিন্তু পেলেন এবছর। একটু কি দেরি করেই পেলেন আপনি? কেমন অনুভূতি আপনার?

তপন বাগচী : মোটেই দেরি হয়নি। সত্তর বছর পেরিয়েও অনেক লেখক এই পুরস্কার পেয়েছেন, সেখানে আমি কেবল ছাপ্পান্নর কোঠায়। তাছাড়া পুরস্কারের জন্য তো কোনো বয়স বেঁধে দেওয়া নেই। প্রস্তাবকরা হয়তো আগেও প্রস্তাব করেছেন, কিন্তু জুরি বোর্ড যখন সন্তুষ্ট হবেন, তখনই তো পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমি মনে করে কর্তৃপক্ষ যখন যোগ্য মনে করেছেন তখন দিয়েছেন। কাজের স্বীকৃতি পেলে একধরনের ভালোলাগা কাজ করে। আরও নতুন কাজের প্রেরণা পাওয়া যায়। সরকারপ্রধান মাননীয় শেখ হাসিনার হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের অনূভূতি তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর কেবল তিনি সরকারপ্রধানই নন, তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। এই পুরস্কার মানে জাতীয় স্বীকৃতি। আমি অভিভূত, উদ্বেলিত, উচ্ছ্বসিত।

মেহেদী হাসান শোয়েব : পুরস্কারপ্রাপ্তি একজন লেখকের উপর কী প্রভাব ফেলে? অনেকে বলেন যে লেখকের দায়িত্ব বা দায় বাড়ায়। কিন্তু পুরস্কার কি দায়িত্বশীল লেখকের স্বীকৃতিই না? আপনি কিভাবে দেখেন বিষয়টাকে?

তপন বাগচী : কোনও লেখক পুরস্কারের জন্য লেখেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। তবে হ্যাঁ, পাঠকের ভালোলাগাকে যদি পুরস্কার হিসিবে গণ্য করা হয়, তবে ওই পুরস্কার অবশ্যই কাম্য। আর প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বা পারিতোষিককে যদি পুরস্কার হিসেবে ধরা হয়, তবে তারও প্রভাব রয়েছে। প্রথমত ওই পুরস্কারের পরে লেখককে যেহেতু অনেকের মধ্য থেকে সনাক্ত করা হয়, তাই তার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে। পারিতোষিক কাজে লাগে বৈষয়িক প্রয়োজনে। আর পুরস্কারের ফলে দায়িত্ব বাড়ে, সেই কথাটিও পুরোপুরি আমি বিশ্বাস করি না। লেখক নিজে থেকেই দায়িত্বশীল না হলে তার লেখার অধিকার থাকে না। লালনকে কে পুরস্কার দিয়েছিল? আজকে তাঁর চেয়ে নন্দিত লেখক কজন? এটিই তো তাঁর পুরস্কার। তবে সরকারপ্রধানের হাত থেকে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গ্রহণ অবশ্যই আমার আত্মবিশ্বাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার আর থামার সুযোগ নেই। এই পুরস্কার আমাকে এই শক্তি দিয়েছে।

মেহেদী হাসান শোয়েব : আপনি লেখক কেনো হলেন? এই উৎসাহ, লেখক হয়ে ওঠার সমর্থন বা যদি বলি রসদ— এসবের সূত্র বা উৎস জানতে চাই।

তপন বাগচী : লিখি বলেই লেখক। ব্যাকরণ তাই বলে। আসলেই কি লেখক হয়েছি? আমি এখনও দ্বিধান্বিত! আমার পরিপার্শ্বই আমাকে লেখক বানিয়েছে। আমি মূলত পাঠক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে স্কুলপাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়েছি। মামাবাড়িতে থাকতাম। ছোটমামা রঞ্জিতকুমার বর বই পড়তেন। মায়ের বাবা, মানে দাদু রসিকলাল বর প্রচুর পড়তেন। ওই বয়সেই জসীমউদ্‌দীনের ছড়া পড়েছি। রবীন্দ্রনাথের ছড়া পড়েছি। ক্লাস সেভেনে পড়ার বয়সেই। না বুঝলওে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ পড়া হয়ে গেছে। কিন্তু লেখার কথা মনে হয়নি। পিতার প্রেরণায় ও চাপে কবিতা লিখতে হয়েছে। এরপর দেখলাম মনের কথা প্রকাশের এ এক অবরাতি সুযোগ। কেবল নিজের মনের কথা নয়, সকলের মনের কথাকে নিজের কথা মনে করেও লেখা হয়ে যায়। সমাজের কথা বলতে পারি এই লেখার মাধ্যমে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সামিল হয়েছিলাম ছড়া ও কবিতা নিয়ে। এখন ফোকলোরচর্চা করি শেকড়ের ইতিহাস জানতে ও জানাতে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছি দেশের গৌরবময় ইতিহাসের কথা জানতে ও জানাতে। এখন লেখাই আমার নিয়তি। না লিখে আর উপায় নেই।

মেহেদী হাসান শোয়েব : আপনি তো শিশুসাহিত্যিক, লোকগবেষক, কবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক। সাংবাদিকতায় পড়েছেন, করেছেন। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আপনার বিচরণ। কোন পরিচয়ে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

তপন বাগচী : কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর চালাতে গিয়ে শিশুসাহিত্য রচনা করেছি। শুরু করেছিলাম কবিতা রচনার মাধ্যমে। এরপর প্রিয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অকাল প্রয়াণে মর্মাহত হয়ে তাঁর জীবনী লিখেছি। ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টারে (এমএমসি) কাজ করতে গিয়ে তৃণমূলের সাংবাদিকতা গবেষণা করেছি। পিএইচডি করার সময় বেছে নিয়েছি বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাগান নিয়ে। তখন থেকে আমার প্রাতিষ্ঠানিক ফোকলোরচর্চার শুরু। সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছি। কিন্তু সকল পরিচয়কেই আমার নিজের পরিচয় মনে করি। যেহেতু কাজ করেছি, তাই পরিচয় দ্বিধা করি না। তবে ভেতরে ভেতরে কবিতার অনুভবকেই লালন করি। একটি কবিতা লিখতে পেরে যে তৃপ্তি পাই, তা অন্য মাধ্যমে পাই না।

মেহেদী হাসান শোয়েব : আপনার সাহিত্যকর্মের উপর গবেষণা করেছেন ভারতের গবেষক। এ বিষয়ে জানতে চাই।

তপন বাগচী : ভারতের গবেষণার আগে বাংলাদেশেই গবেষণা করেছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী দোলা বসু গবেষণা করেছেন আমার মরমি গান নিয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের প্রফেসর ড. অনুপম হীরা মণ্ডল আমার সাহিত্য নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। কুমিল্লা সমবায় একাডেমির তৎকালীন উপাধ্যক্ষ ও বর্তমানে সরকারের উপসচিব হরিদাস ঠাকুর আমার কবিতা নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া খুলনার মুর্শিদা আহমেদ ও ঢাকার ড. আখতরুজ্জাহান আমার সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের গ্রন্থ এখনো অপ্রকাশিত। আর ভারতের নদিয়ার বিশিষ্ট গবেষক শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ আমার শিশুসাহিত্য নিয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. তরুণ মুখোপাধ্যায় আমার কবিতা নিয়ে, কবি-সাংবাদিক নরেশমণ্ডল এবং দিল্লির মনীষা কর বাগচী আমার কবিতা নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অমিতাভ বিশ্বাস আমার মরমিগানের সংকলন করেছেন। কলকাতা বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজের অধ্যাপক ড. স্বাতী রায়চৌধুরী আমার ৪০টি কবিতা অনুবাদ করেছেন। আরও অনেক গবেষক আমার সাহিত্য নিয়ে গবেষণার আগ্রহ দেখিয়েছেন। বারান্তরে সেই তথ্য জানা যাবে।

মেহেদী হাসান শোয়েব : আপনার সাহিত্যিক জীবনকে কেমন উপভোগ করেন? এ জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা বলুন।

তপন বাগচী : সাহিত্যিক জীবন ভোগের নয়, ত্যাগের। এবং আনন্দ বেশি সেই ত্যাগেই। এই সাহিত্য করতে গিয়ে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়েছে। বিদেশে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার হাতছানি ত্যাগ করেছি। আমার বন্ধুরা ডাক্তার-ইঞ্জিয়ার আর আমি ছাপোষা কবি। পরিবার-পরিজনকে সময় দিতে পারিনি। সারাদেশের ঘুরে বেড়িয়েছি ঘরে সময় না দিয়ে। এইসব ত্যাগের ঘটনাই আমাকে লিখতে রসদ জুগিয়েছে। আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি? হিসেবে করিনি। নিন্দা যতটুকু জুটেছে, ভালবাসা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি।

মেহেদী হাসান শোয়েব : সাহিত্যিক হওয়ার জন্য কখনও কি আফসোস হয়?

তপন বাগচী : আফসোস হবে কেন? সাহিত্যিক হয়েছি বলে গর্ব হয়। একজন ক্ষুদ্র সেবক হিসেবে বাংলা সাহিত্যের সেবা করতে পারছি, এর মাধ্যমে দেশের সেবা করতে পারছি, একজীবনে এইটুকু বা কম কীসের?

মেহেদী হাসান শোয়েব : আপনার নিন্দুকদের জন্য কী বলবেন?

তপন বাগচী : নিন্দুকেরা আমার পরম বন্ধুর মতো কাজ করছে। তারা আছে বলেই আমাকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। আর এইটুকু বুঝি যে নিন্দুকেরা শক্তিশালী হলেও তারা পরাজিতের বংশধর।

মেহেদী হাসান শোয়েব : লিখতে চান, অথচ এখনও লেখা হয়নি কী?

তপন বাগচী : প্রকৃত লেখার মতো কিছুই লেখা হয়নি এখনো। একটা ভাল কবিতা লেখার বড় লোভ হয়। আমাদের অবহেলিত জনগোষ্ঠী যেমন কায়পুত্র সম্প্রদায় নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার বড় সাধ হয়। জানি না, কখন সেই আশা পূর্ণ হবে।

মেহেদী হাসান শোয়েব : বইমেলা শুরু হয়েছে। আপনার এবছর বইমেলায় কী কী বই আসছে?

তপন বাগচী : দুটি ছড়ার বই, একটি কবিতার বই আছে নতুন। তিনটি প্রবন্ধের বইয়ের পুনর্মুদ্রণ আসছে। আর আমার লেখা কবিতা ও গানের কবিতা নিয়ে বের হচ্ছে ‘কবিতাসংগ্রহ’। বেশ কিছু সাক্ষাৎকার দিয়েছি, সেটি নিয়ে বের হবে ‘সাক্ষাৎকারসংগ্রহ’। হয়তো এই সাক্ষাৎকারটিও সেখানে থাকতে পারে।

মেহেদী হাসান শোয়েব : নতুন যারা লেখার জগতে আসছেন, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

তপন বাগচী : আমি তো আমাকেই নতুন লেখক ভাবি এখনো। পরামর্শ একটাই , প্রচুর পড়তে হবে। চিরকালীন লেখা যেমন পড়তে হবে, সমকালীন লেখাও পড়তে হবে। প্রতিটি লেখারই কিছু করণকৌশল আছে, সেগুলো রপ্ত করার আগে বই প্রকাশ করা ঠিক হবে না। বিষয় যা-ই হোক, নতুন করে ভাবতে হবে। আশা করি নতুনদের অবদানে আমাদের সাহিত্য ক্রমশ পরিণত হয়ে উঠবে।

মেহেদী হাসান শোয়েব : রোজকার খবরের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অভিনন্দ এবং শুভেচ্ছা জানাই। আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। আপনার আরও সফলতা এবং সমৃদ্ধি প্রত্যাশা করি। আপনার সৃজনশীল কাজে দেশ ও মানুষ উপকৃত হোক। শুভ সময়।

বিষয়:
পরবর্তী খবর

নজরুল জয়ন্তী আয়োজন ২০২৪

তুমি ধূমকেতুর মতো আসো

তোমার শব্দের ধ্বনি পৌঁছেছে মানুষের হৃদয়ে,
তোমার শব্দ মানুষকে আনন্দে ভাসায়।
ওই যে তোমার সেই শ্যামা সংগীত–
“কালো মেয়ে পালিয়ে বেড়ায়/ কে দেবে তায় ধ’রে”
তুমিও ‘বিষের বাঁশি; ছেড়ে কালো মেয়ের মতো পালিয়ে গেলে,
তুমি ধূমকেতুর মতো আসো, বুকের আঁচল পেতে নেবে আমাদের সাহিত্য।
তারপর তুমি আর আমাদের কবিতা পাশাপাশি হেঁটে যাবে বহুদূর।
কোন উপমা নেই, তোমার রসদ চায় কবিতা সকাল সন্ধে।
ধন্য ধন্য তুমি সাম্যের গান গেয়ে,
ভালোবাসা এনেছিলে স্বর্গ থেকে বেয়ে।‌

প্রেম-দ্রোহ আর সাম্য নিয়ে ধূমকেতুর মতো আরেকবার আসো।

লেখক : কবি

পরবর্তী খবর

নজরুল জয়ন্তী আয়োজন ২০২৪

দুঃখু মিঞার জন্মদিনে

ঝাকড়া চুলে দুঃখু মিঞার
শিশু কাল কতো-না
দুঃখ-কষ্টে ভরা,
তুমি বিদ্রোহী কবি-নজরুল
তোমার লেখনী-তে
অগ্নিঝরা।

 

লেখক : ছড়াকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত