রাজনীতি

রাজনীতি

সংসদীয় রীতিনীতি তোয়াক্কা না করার অভিযোগ হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে

গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো ক্ষমতার সুষম ভারসাম্য রক্ষা। কিন্তু সংসদীয় রীতিনীতি ও স্পিকারের রুলিং অমান্য করে সংসদে অপ্রাসঙ্গিক এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে। তার এ ধরনের বক্তব্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্যকে ক্ষুণ্ণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গণতান্ত্রিক ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক রীতি
আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই তিন স্তম্ভের স্বাধীন ও স্বকীয় ভূমিকার ওপরই গণতন্ত্রের বিকাশ নির্ভরশীল। একটি বিভাগ অন্য বিভাগের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিলের রায় এবং তা বিনা সংঘাতে মেনে নেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সংসদে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। ভারতের লোকসভা বা ব্রিটিশ ‘হাউস অব কমন্স’-এর ঐতিহ্য অনুযায়ী, আদালতের রায়ের পর তা নিয়ে আইনসভায় নেতিবাচক আলোচনা বিচার বিভাগের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

নতুন সংসদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সংসদে জুলাই আন্দোলনের বেশ কয়েকজন তরুণ মুখ রয়েছেন। দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, তারা সংসদীয় রীতির সুস্থ চর্চা শিখে দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গড়ে উঠবেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, জামায়াত-এনসিপি জোটের মনোনয়নে নির্বাচিত তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদীয় রীতিনীতি শেখার চেয়ে সংসদকে বিতর্কিত ও অকার্যকর করার রাজনীতিতে মেতে উঠেছেন।

একদিকে তিনি নিজের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে বেশ সোচ্চার। গত এপ্রিলে তিনি প্রতিটি উপজেলায় ইউএনও বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের মতো সংসদ সদস্যদের জন্যও সরকারি গাড়ির দাবি তুলেছিলেন। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংসদের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংসদে দাঁড়িয়ে অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছেন।

স্পিকারের রুলিং ও কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ
গত ২৫ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। অভিযোগ রয়েছে, এর মাধ্যমে তিনি গত ২১ জুন স্পিকারের দেওয়া স্পষ্ট রুলিং লঙ্ঘন করেছেন। স্পিকার তার রুলিংয়ে বলেছিলেন, “যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত।”

বিশ্লেষকদের মতে, হাসনাতের এই বক্তব্য সরাসরি সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির পরিপন্থী। কার্যপ্রণালী বিধির ২৭০ নম্বর বিধির (১) উপধারায় বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা, (৬) উপধারায় অশালীন শব্দ ব্যবহার এবং (৭) উপধারায় অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানিকর মন্তব্য করার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আদালত অবমাননা ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞার শঙ্কা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে আদালতের রায়কে অমান্য করে আদালত অবমাননা করেছেন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যার বিরুদ্ধে তিনি বিষোদগার করেছেন, তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে গুলশান থানায় দায়ের করা একটি মামলা (নং ২৭(৪)২১) দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ খারিজ করে দেয়। বাদীপক্ষের নারাজি আবেদন বাতিল করে আদালত অভিযুক্তকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করেন। অভিযোগ উঠেছে, চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় সংসদে টেনে এনে তিনি মূলত আইনের শাসনকে অবজ্ঞা করেছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। মব বা গণ-উন্মাদনার ওপর ভর করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক সৃষ্টি করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না; এটি মূলত ভিন্ন আঙ্গিকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদের’ বহিঃপ্রকাশ। দেশের বেসরকারি খাত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন রক্ষার্থে এই অপতৎপরতা রুখে দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়:
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
PhotoCard Icon
Create PhotoCard