শিল্প-সাহিত্য

শিল্প-সাহিত্য

রবি ঠাকুরের পদ্মা নদী : বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ

পদ্মাকে যে দেখেনি বাংলাকে দেখেনি সে; পদ্মাকে যে বোঝেনি বাংলাকে বোঝেনি সে; যা কিছু দেখা জানা বোঝা সমস্ত সংহত এই নদীটির মতো। রাজপুত্রী চিত্রাঙ্গদার মতো শিবের অভিপ্রায় অগ্রাহ্য করে মহানদ জন্মগ্রহণ করলেন মহানদীরূপে। পদ্মা রাজপুত্রী চিত্রাঙ্গদাই বটে। যুগ্মতীরতূণীরা বন্যাবহুল অসংখ্য বন্যযোগ্য সহচরী সহায় স্বেচ্ছাচারিণী শিকারবিনোদে বহির্গমা মহানদী পদ্মা। ভগীরথের সঙ্গ স্বনন অনুসরণ করে ভাগীরথীর সঙ্গে একাকার হয়ে আসছিল, তারপর হঠাৎ করে কী মতি হলো অভীষ্ট পথ অগ্রাহ্য করে, ভাগীরথীর বন্ধন ছিন্ন করে, মহোল্লাসে ঢুকে পড়লো এই পান্ডববর্জিত দেশে। তার পদধ্বনি শুনতে পেয়ে হিমালয়ের ব্রক্ষ্মরন্ধ্র ভেদ করে ছুটে চলে এলো যমুনা নাম ধারণ করা ব্রক্ষ্মপুত্র নদ, ছুটে এলো আসামের দুর্গম অরণ্য লঙ্ঘন করে মেঘনা, তখন তিন জনে তিনে এক একে তিন ভৈরব আবার ধাবিত হলো মহাসমুদ্রের পানে।

গঙ্গা চলেছে দুই কূলের বন্ধন রক্ষা করে, শাস্ত্র এবং আচারের শাসন স্বীকার করে, দেশে দেশে মুক্তি বিতরণ করে, শাপে ভস্মীভূত সগর রাজার দুর্বিনীত সন্তানদের মুক্তিদানের উদ্দেশ্যে। পদ্মা মুক্তিদান করে না, মুক্ত করে। সে শৃঙ্খলকে করে উর্ণতন্তু, পায়ের বেড়িকে করে পায়জোড়, কৃষককে করে কিরিচধারী, করণিককে করে শস্ত্রপাণি, বাদীকে করে বীর, আর মহালগ্ন সমুপস্থিত হলে কারাগারকে দেয় অতলে তলিয়ে, তখন প্রভঞ্জনে বাজে প্রলয়ের শঙ্খ, সেই সামাল সামাল রবের দিনে বীরে আর ভীরুতে, পুরুষে আর নারীতে, শমর্থে ও অশক্তে ভেদ ঘুচে যায়-সকলেই হয়ে ওঠে যোদ্ধা, ঘরে ঘরে বাজে দামামা। তখন সকলে হয় চিত্রাঙ্গদার মৃগয়া সহচর। ভাগীরথী ভারতের বন্দনীয়, আর পদ্মা ভারতের সমস্যারূপিণী। একজনের সকল সমস্যার অন্ত, আর একজন নব নব সমস্যার সৃষ্টি; একজনে জীবনতানের সম, আর একজনে জীবনতানের চিরন্তন ধুয়া, গঙ্গা শান্তি আর পদ্মা অশান্ত।

সেই পদ্মা চলেছে দুই কূল ভেঙে, নভস্পর্শকীর্তিবাসিকে অতলে তলিয়ে দিয়ে, বাগবাগিচা অরণ্য কান্তার পল্লীজনপদ রাজ্য রাজধানী কিছুরই প্রতি তার ভ্রুক্ষেপ নাই। শস্যগৌরবে আজ যে রাজা, গোত্রহীনতায় আজ সে কাঙাল, এক রাতের মধ্যে তাদের ভূমিকা বদলে দেয় খলখলহাসিনী এই খেয়ালিনী। রাজা ও রাখাল, ধনী ও নির্ধন, কৃষক ও ভূস্বামী সকলে তার শাসনে সশঙ্ক। সকলেরই আজ আছে, কাল সম্বন্ধে কেউ নিঃসংশয় নয়। এক পাড়ে ভাঙছে সে ইতিহাস আর এক পাড়ে গড়ছে ভূগোল, এক পাড়ে ভাঙছে কূল, আর এক পাড়ে ফেলছে চর, ভৌগলিক ভেবে পায় না কোথায় তার সীমানা টানবে। ঐতিহাসিকে সম্ভব না হলেও কবিতে আছে সে সম্ভাবনা। সেই আদিমকাল থেকে এই মহানদী অপেক্ষা করে আছে তার যোগ্য মহাকবির জন্য। অবশেষে রবীন্দ্রনাথে পেয়েছে সেই মহাকবিকে।

বাস্তবিক রবীন্দ্রনাথের মতো মহাকবির দৃষ্টিতে পদ্মাকে আর কেউ দেখেনি। বছরের পর বছর ঋতুর পর ঋতু পদ্মাকে নিরীক্ষণ করে তিনি তার বিশ্বরূপ দর্শন করতে সমর্থ হয়েছেন। চর্মচক্ষের দৃষ্টির সঙ্গে ক্রমে যুক্ত হয়েছে কল্পনার দৃষ্টি ও দিব্যদৃষ্টি। এই তিন দৃষ্টির সন্মুখে পদ্মা উদঘাটিত করে দিয়েছে তার অপার রহস্য, কিছুই গোপন রাখেনি। কেনইবা রাখবে? সেতো অনাদিকাল থেকে অপেক্ষা করে ছিল এমন একজন মহাকবির জন্যে। কবির চোখে, ভাবুকের চোখে যে তাকে দেখতে চাইবে। তার আশা এতোদিনে সফল হয়েছে। কবি দেখেছেন ঋতুভেদে তার বেশ ও বসন পরিবর্তন। নববর্ষায় নীল, ভরা বর্ষায় গৈরিক, শরতে আসমানি, শীতে সবুজঘেঁসা, শীতান্তে স্বচ্ছ ডুরে আর বসন্তে বালুচরী। বসনের কত রঙ, কত রঙের বসন। সে সব বসনে রাতের বেলায় তারার ফুলকাটা, দিনের বেলায় নানা রঙের মেঘের ছোপ, আর রোদ্রের আভায় প্রত্যেক তরঙ্গশীর্ষে মনিমুক্তা হিরকের কাজ। আর রূপেরই কী অন্ত আছে? কখনো তরঙ্গভীষণ, কখনো প্রভঞ্জনে উন্মাদ, কখনো বিলাসান্তে শ্রান্তক্লান্ত শয্যাশায়িতা, কখনোবা অসংখ্য তরণীর সাদা পালের চন্দনের পত্রলেখায় অপরূপা, আর শীতান্তে ডুরে শাড়িখানা গায়ে জড়িয়ে তন্বী কিশোরীর মতো চঞ্চল চরণে গৃহকার্যনিরতা বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড় ভালোবাসি।

রবীন্দ্রচিত্তের গতিমন্ত্রের দীক্ষাদাত্রী তখন পদ্মানদী। বহুকাল পরে এলাহাবাদের গঙ্গার চির চলমান রূপ দর্শনে গতিময় বিশ্বের যে কল্পনা কবির মনে জেগেছিল সেই গঙ্গার মধ্যেই এই পদ্মার প্রতিফলন। পদ্মা, গঙ্গা, আকাশগঙ্গা তিনটি ক্রমপ্রাগ্রসর পদক্ষেপ। বলাকায় বিবৃত গতিতত্ত্বের মূলানুসন্ধানের জন্য কোন বিদেশি দার্শনিকের বা ভারতীয় প্রাচীন দর্শনের শরনাপন্ন হওয়া আবশ্যক। এ ভাবটি ধীরে ধীরে কবির মনের বীজ থেকে পল্লবিত হয়ে উঠেছিল। ছিন্নপত্রাবলীতে তার বিবরণ এবং পদ্মায় তার মূল নিহিত। কবিত্বের বিকাশ তত্ত্ব থেকে নয়, স্বোপার্জিত অনুভূতি থেকে। সেই অনুভূতির প্রথম আভাস কবিচিত্তে দিয়েছে পদ্মানদী। চর্মচক্ষের দর্শন কল্পনানেত্র হয়ে দিব্যদৃষ্টিতে পৌঁছেছে। পদ্মার এই ভাঙন প্রবনতার জন্যই বুঝিবা হাডিঞ্জ ব্রিজের মতো একটা বড় সেতু নির্মাণের চেয়ে এর নদীশাসনের বিষয়টিকে প্রকৌশলীদের বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছিল।

(লেখাটি ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ইতিহাস’ গবেষণা গ্রন্থ থেকে গৃহীত)

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক, কবি, কথাসাহিত্যিক।

বিষয়:
পরবর্তী খবর

নজরুল জয়ন্তী আয়োজন ২০২৪

তুমি ধূমকেতুর মতো আসো

তোমার শব্দের ধ্বনি পৌঁছেছে মানুষের হৃদয়ে,
তোমার শব্দ মানুষকে আনন্দে ভাসায়।
ওই যে তোমার সেই শ্যামা সংগীত–
“কালো মেয়ে পালিয়ে বেড়ায়/ কে দেবে তায় ধ’রে”
তুমিও ‘বিষের বাঁশি; ছেড়ে কালো মেয়ের মতো পালিয়ে গেলে,
তুমি ধূমকেতুর মতো আসো, বুকের আঁচল পেতে নেবে আমাদের সাহিত্য।
তারপর তুমি আর আমাদের কবিতা পাশাপাশি হেঁটে যাবে বহুদূর।
কোন উপমা নেই, তোমার রসদ চায় কবিতা সকাল সন্ধে।
ধন্য ধন্য তুমি সাম্যের গান গেয়ে,
ভালোবাসা এনেছিলে স্বর্গ থেকে বেয়ে।‌

প্রেম-দ্রোহ আর সাম্য নিয়ে ধূমকেতুর মতো আরেকবার আসো।

লেখক : কবি

পরবর্তী খবর

নজরুল জয়ন্তী আয়োজন ২০২৪

দুঃখু মিঞার জন্মদিনে

ঝাকড়া চুলে দুঃখু মিঞার
শিশু কাল কতো-না
দুঃখ-কষ্টে ভরা,
তুমি বিদ্রোহী কবি-নজরুল
তোমার লেখনী-তে
অগ্নিঝরা।

 

লেখক : ছড়াকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত