অর্থ ও বাণিজ্য, লিড নিউজ

অর্থ ও বাণিজ্য, লিড নিউজ

৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার

অর্থনীতির নতুন ‘গেমচেঞ্জার’ হতে পারে হালাল শিল্প, কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে ‘হালাল শিল্প’ বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় এটি নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরেও বিষয়টি উঠে এসেছিল। বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির এই বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

হালাল শিল্প কী?
হালাল শিল্প শুধু খাবার বা মাংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইকো-সিস্টেম’। এর আওতায় ব্যাংকিং, পর্যটন, হালাল হোটেল, লজিস্টিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং মডেস্ট ফ্যাশন (মার্জিত পোশাক)-এর মতো নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত। সহজ কথায়, কোনো পণ্য বা সেবার কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্যাকেজিং, পরিবহন এবং ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ইসলামিক শরিয়াহ বা হালাল পদ্ধতি মেনে চললে তাকে হালাল শিল্প বলা যায়।

মালয়েশিয়া কেন ‘রোল মডেল’?
প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় মালয়েশিয়া হালাল শিল্পে বিশ্বের অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ মালয়েশিয়ার হালাল বাজার ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা ২০১৮ সালে ছিল ৬৮ বিলিয়ন ডলার। শুধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ খাতই ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হবে।

মালয়েশিয়া ১৯৭০-এর দশক থেকে ধাপে ধাপে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তাদের ‘জাকিম’ (JAKIM) বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া, হালাল শিল্পের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি প্রসারে হালাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (HDC) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রণব কুমার ঘোষ মনে করেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের হালাল শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘গেমচেঞ্জার’ হতে পারে।

তবে, প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো হালাল সার্টিফিকেশন বা সনদ প্রদান। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ জানান, সার্টিফিকেশন সমস্যার কারণে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ এখনো বেশ পিছিয়ে। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই হালাল সনদ দিচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত আধুনিক ল্যাবরেটরি ও টেস্টিং সক্ষমতার অভাবে আন্তর্জাতিক মানের সনদ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী জানান, আধুনিক জবাইখানা এবং মানসম্মত অবকাঠামোর অভাবে হালাল মাংস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট ‘হালাল অর্থনৈতিক জোন’ এই সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

কী করতে হবে?
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৮৫ কোটি ডলারের হালাল কৃষিপণ্য রপ্তানি করছে। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়তে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদের ব্যবস্থা করা জরুরি। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। সরকারি উদ্যোগ ও যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু মালয়েশিয়াতেই নয়, ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
PhotoCard Icon
Create PhotoCard