জাতীয়, লিড নিউজ

জাতীয়, লিড নিউজ

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো : কবে থেকে কার্যকর, কী থাকছে গেজেটে?

নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার ঘোষণা থাকলেও এখনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করেনি সরকার। অর্থমন্ত্রী নিজেই তার বাজেট বক্তব্যে পহেলা জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কথা নিশ্চিত করেছিলেন। তবে ঠিক কত শতাংশ বেতন বাড়ছে বা কোন গ্রেডের কী অবস্থা— তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল নিয়ে চাকরিজীবীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা থাকলেও, কবে নাগাদ এটি পুরোপুরি আলোর মুখ দেখবে, তা নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক আদেশ, গেজেট প্রকাশ এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ এই গেজেট প্রকাশ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই এই বেতন কার্যকর হওয়ার কথা। গেজেট প্রকাশে দেরি হলেও, যখনই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হোক না কেন, চাকরিজীবীদের বকেয়াসহ বেতন পরিশোধ করার বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামো ‘যথাসময়েই’ বাস্তবায়িত হবে।

২০১৫ সালে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর থেকে প্রতি বছর মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পেলেও নতুন কোনো পে-স্কেল পাননি সরকারি চাকরিজীবীরা। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করা হয়েছিল। গত ২২ জানুয়ারি তারা সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। ওই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এছাড়া ওই কমিশন বৈশাখি ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ এবং যাতায়াত ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ব্যাপক সংস্কারের কথা বলেছিল। এই পুরো সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ইতোমধ্যেই নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে, যার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমানে চূড়ান্ত গেজেট তৈরির কাজ চলছে।

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিগত ১১ বছরের স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতির কথা উল্লেখ করে তার বাজেট বক্তব্যে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, একবারে নয় বরং কয়েকটি ধাপে এটি কার্যকর করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে শুরুতে শুধু মূল বেতন বা বেসিক বাড়ানো হবে। এরপর পরবর্তী বছরগুলোতে পর্যায়ক্রমে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ও শিক্ষা ভাতার মতো অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলো সমন্বয় করা হবে।

এই বিপুল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ এই বরাদ্দের পরিমাণ এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। এছাড়া ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থনীতিবিদরা কিছু বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এটি সরকারের ওপর বড় আর্থিক দায় তৈরি করলেও একে ব্যয় হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর প্রভাবে যেন বাজারে সার্বিক মূল্যস্ফীতি না বাড়ে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।

অন্যদিকে, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ জানান, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা থাকলেও সাধারণ মানুষের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে তা ভাবা জরুরি। তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয় মানুষের টাকায়। তারা মানুষকে যথাযথ সেবা দিচ্ছে কি না, তাকে নিশ্চিত করতে হবে। বেতনও বাড়ল, আবার দুর্নীতিও চলতে থাকল—এমন হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে বলে তিনি মনে করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত
PhotoCard Icon
Create PhotoCard