
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশজুড়ে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আসা আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান আমাদের এক ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুলাই মাস মানেই এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বিস্তারের মোক্ষম সময়, আর এই চেনা সমীকরণ জানা থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছরের মতো এবারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর প্রস্তুতিতে সেই চেনা গলদ ও উদাসীনতাই দৃশ্যমান হচ্ছে। বিগত বছরগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বড় পৌরসভাগুলোর অনেক আগেই কোমর বেঁধে নামার কথা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, মশা নিধনের নামে এখনো সেই পুরোনো, অকার্যকর লার্ভিসাইড ছিটানো এবং লোকদেখানো ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম।
কেবল নাগরিকদের সচেতনতার অভাবকে দায়ী করে বা জরিমানা করে সিটি কর্পোরেশন নিজের দায় এড়াতে পারে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখন প্রয়োজন একটি বছরব্যাপী সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। ড্রেন পরিষ্কার, পরিত্যক্ত জলাশয় ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে নিয়মিত তদারকি এবং কার্যকর ওষুধ ছিটানোর মূল দায়িত্বটি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকেই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। মশক নিধন কার্যক্রমে ব্যবহৃত ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি তা প্রয়োগে নিয়োজিত কর্মীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ অনুযায়ী মশা নির্মূলের বিজ্ঞানসম্মত উপায় বের করা এখন সময়ের দাবি।
পাশাপাশি, স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা এবং প্রস্তুতি নিয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে ইতিমধ্যেই ডেঙ্গু রোগীর ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি কীভাবে জরুরি মুহূর্তে আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন) এবং আইসিইউ শয্যার জন্য হাহাকার তৈরি হয়েছিল। এবার যেন সেই সংকটের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এখনই আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে। ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে টেস্টের ফি ও চিকিৎসার ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, যেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ শুরুতেই রোগ শনাক্ত করে সুচিকিৎসা পেতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একক সংস্থার কাজ নয়, বরং এটি সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য খাত এবং সাধারণ জনগণের একটি সমন্বিত যুদ্ধ। নীতিনির্ধারকদের উচিত আর কোনো কালক্ষেপণ না করে ঢাকার দুই মেয়র এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের মধ্যে একটি নিবিড় ও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। এছাড়া ডেঙ্গু এখন আর কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক সমস্যা নয়, তাই ঢাকার বাইরেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই কেবল উদ্বেগ প্রকাশ নয়, ডেঙ্গু মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে আমরা দৃশ্যমান, কঠোর ও সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই।